কেন নিভৃতেই বিদায় নিলেন রিজিয়া রহমান?

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

কেন নিভৃতেই বিদায় নিলেন রিজিয়া রহমান?

খোলা কাগজ ডেস্ক ৯:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০১৯

print
কেন নিভৃতেই বিদায় নিলেন রিজিয়া রহমান?

কথাশিল্পী রিজিয়া রহমানের অন্তিমযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন তিনজন লেখক। একজন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। অন্য দুজন গল্পকার মোজাফ্ফর হোসেন ও নূর কামরুন নাহার।

এ ছাড়া নাটকের লোক ছিলেন তিনজন- নাট্যকার মামুনুর রশীদ, অভিনেত্রী দিলারা জামান ও শর্মিলা আহমেদ। আর ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। এ কজন ছাড়া শিল্প-সাহিত্য জগতের আর কেউ কি উপস্থিত ছিলেন? ঠিক জানি না। থাকলেও সংখ্যায় তা পাঁচজনের বেশি হবে না। বাকি যারা ছিলেন তারা রিজিয়া রহমানের আত্মীয়স্বজন। একজন গৌণ লেখক হিসেবে আমি সেদিন ঢাকা থেকে বহু দূরের এক প্রত্যন্ত এলাকায় ছিলাম বলে উপস্থিত থাকতে পারিনি। এজন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

রিজিয়া রহমানের প্রকাশকের সংখ্যাও কম নয়। তাদের কেউ কি সেদিন উপস্থিত ছিলেন? ঠিক জানা নেই। কোনো মানুষের অন্তিমযাত্রায় কে উপস্থিত থাকল আর কে থাকল না, তাতে মৃত মানুষটির কিছু যায় আসে না। তিনি তখন সর্বপ্রকার যাওয়া-আসার ঊর্ধ্বে উঠে যান। তবু কেন উপস্থিত থাকতে হয়? এজন্য যে, উপস্থিতির মধ্য দিয়ে জাতির কাছে, প্রজন্মের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছানো যে, তোমরা দেখো, যে মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তিনি গুণী মানুষ ছিলেন, কর্মবীর মানুষ ছিলেন। তোমরা তার বন্দনা করো। তার মতো গুণী হয়ে ওঠার চেষ্টা করো। এই হচ্ছে অন্তিম যাত্রায় জীবিতদের উপস্থিত থাকার গুরুত্ব।

রিজিয়া রহমান তো লেখক। বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ একজন কথাশিল্পী। তার অন্তিমযাত্রায় সিনিয়র-জুনিয়র লেখক কেন উপস্থিত ছিলেন না? সেদিন কি সবাই মরে গিয়েছিলেন? জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন? নাকি সবাই ঢাকার বাইরে ছিলেন? না, মরেননি, ঘুমিয়েও পড়েননি, সবাই ঢাকার বাইরেও ছিলেন না। বিস্তর লেখক ঢাকায় ছিলেন। বিস্তর প্রকাশক এবং প্রকাশক নেতাদের অনেকে ঢাকায় ছিলেন। ঢাকার রাস্তাঘাটও ফাঁকা ছিল। ইচ্ছে করলেই যেতে পারতেন। কিন্তু যাননি। যাদের যাওয়ার কথা তারা ব্যাপারটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেলেন।

কেন যাননি? হয়তো এ কারণে যে, রিজিয়া রহমান ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন নিভৃতচারী লেখক। আমাদের যাবতীয় কোলাহলের বাইরের, আমাদের মিডিয়ার ফ্রেমের বাইরের একজন লেখক ছিলেন তিনি। মিডিয়ার একটা ফ্রেম আছে। মিডিয়া এই ফ্রেমটি সহজে ভাঙতে পারে না। কেবল এক দিকেই ধরে রাখে। সহজে ঘোরাতে পারে না। এই ফ্রেমের মধ্যে যারা ঢুকে পড়তে পারেন, তারা গৌণ লেখক হলেও মিডিয়া তাদের বড় লেখক বানিয়ে দেয়। মিডিয়া তাদের নামে জয়ধ্বনি তোলে, তাদের বন্দনায় মুখর থাকে। আর যারা এই ফ্রেমের মধ্যে ঢুকতে পারেন না বা ঢুকতে চান না, তারা যত বড় লেখক-শিল্পীই হোন না কেন, থেকে যান আড়ালে, চলে যান নিভৃতে। যেমন রিজিয়া রহমান।

প্রশ্ন, মিডিয়ার দায়িত্ব কি এই? মিডিয়ার কি কোনো দায় নেই? একজন বড় লেখককে, বড় শিল্পীকে জাতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায় মিডিয়ার আছে কিনা? নাকি তেলা মাথায় তেল দেওয়াই তাদের কাজ? নাকি মিডিয়ার শীর্ষ পদে যারা বসে আছেন তাদের বেশির ভাগই মূর্খ? ঠিক উত্তরটি জানা নেই।

রিজিয়া রহমান চলে গেলেন চার দিন হলো। তার প্রয়াণে কোনো নাগরিক শোকসভা হবে কি? আমাদের জ্যেষ্ঠ লেখকরা কি এমন কোনো উদ্যোগ নেবেন? সরকারি বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান কি কোনো শোকসভার আয়োজন করবে? প্রকাশিত হবে কি কোনো স্মারকগ্রন্থ? মনে হয় না। তেমন কোনো উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

রিজিয়া রহমানের অন্তিমযাত্রার মধ্য দিয়ে বোঝা গেল আসলে আমরা কী চাই, কাকে চাই। বোঝা গেল আমরা কোন পথে হাঁটছি, আমাদের গন্তব্য কোথায়।

স্বকৃত নোমান
কথাসাহিত্যিক