ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে...

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে...

নিজস্ব প্রতিবেদক ৯:৫০ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৭, ২০২০

print
ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে...

দরাজ কণ্ঠে গেয়েছিলেন ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, রইব না আর বেশি দিন তোদের মাজারে’ এ গানটি শুনে আবেগতাড়িত হননি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু গানের কথার মতোই চলে গেলেন কিংবদন্তি গায়ক এন্ড্রূ কিশোর। গত সোমবার সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গেলেন ওপারে।

প্লেব্যাক সম্রাট-খ্যাত এ শিল্পীর ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস’, ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমার ছুঁয়াতে খুঁজে পেয়েছি’ গানগুলো পাল্টে দেয় বাংলাদেশের গানের জগৎকেই। বাংলাদেশের আধুনিক ও চলচ্চিত্রজগতের কালজয়ী অনেক গান এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে সমৃদ্ধ হয়েছে। সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ, প্রেম-বিরহ—সব অনুভূতির গানই তিনি গেয়েছেন। সূরের মূর্ছনায় গানপাগল অগণিত মানুষ তার কণ্ঠের জাদুতে বিমোহিত হয়ে যেতেন। নিজেরাই গুণগুণ করে গাইতেন। তার মৃত্যুতে বাংলা প্লেব্যাক গানের একটি ইতিহাসের সমাপ্তিও ঘটল।

উল্লেখ্য, ৬৫ বছর বয়সে ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলে গেলেন এই শিল্পী। টানা ৯ মাস সিঙ্গাপুরে ক্যানসারে চিকিৎসাধীন থেকে গত ১১ জুন এয়ার অ্যাম্বুলেন্স যোগে দেশে ফিরেছিলেন এন্ড্রু কিশোর। তারপর থেকে রাজশাহী মহানগরীর মহিষবাথান এলাকায় বোন ডা. শিখা বিশ্বাসের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ক্যানসারে আক্রান্ত এই শিল্পী।

জন্ম ও শিল্পীজীবন : কিংবদন্তি এ শিল্পীর জন্ম ৪ নভেম্বর, ১৯৫৫ সালে রাজশাহীতে। সেখানেই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর। এন্ড্রূ কিশোর প্রাথমিকভাবে সংগীতের পাঠ শুরু করেন রাজশাহীর আবদুল আজিজ বাচ্চুর কাছে। একসময় গানের নেশায় রাজধানীতে ছুটে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, আধুনিক গান, লোকগান ও দেশাত্মবোধক গানে রেডিওর তালিকাভুক্ত শিল্পী হন। ১৯৭৭ সালে আলম খানের সুরে ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রে ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গানের মধ্য দিয়ে এন্ড্রূ কিশোরের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক যাত্রা শুরু হয়। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তার রেকর্ডকৃত দ্বিতীয় গান বাদল রহমান পরিচালিত এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী চলচ্চিত্রের ‘ধুম ধাড়াক্কা’। এন্ড্রূ কিশোর বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বাধিক ১৫ হাজার গান গাওয়া শিল্পী। চলচ্চিত্রে তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় গান আর কারও নেই।

উল্লেখযোগ্য গান : তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য আরও গানের মধ্যে রয়েছে- ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস’, ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমার ছুঁয়াতে খুঁজে পেয়েছি’, ‘আমার বুকের মধ্যে খানে’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘পড়ে না চোখের পলক’, ‘পদ্মপাতার পানি’, ‘ওগো বিদেশিনী’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’, ‘আমি চিরকাল প্রেমের কাঙাল’ প্রভৃতি।

পরিবার : এন্ড্রু কিশোর সংসার জীবনে স্ত্রী লিপিকা এন্ড্রু এবং সজ্ঞা (২৬) নামে এক মেয়ে  ও সপ্তক (২৪) নামে এক পুত্র সন্তান রেখে গেছেন। তার দুজনই বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াতে পড়াশোনা করছেন। সজ্ঞার পড়াশোনা প্রায় শেষের দিকে।

পুরস্কার : এন্ড্রু কিশোর আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য দেশ-বিদেশের আরও অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন উপমহাদেশের খ্যাতনামা এ শিল্পী।

শেষকৃত্য ১৫ জুলাই, পছন্দের স্থানে সমাধি : বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের শেষকৃত্য আগামী ১৫ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে প্রখ্যাত এই শিল্পীর বোন জামাই ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. প্যাট্টিক বিপুল বিশ্বাস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বুধবার রাতে এন্ড্রু কিশোরের ছেলে এন্ড্রু জুনিয়র সপ্তক অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরবেন। তবে শিল্পীর মেয়ে সংঘার ফিরতে দেরি হচ্ছে। তিনি ফিরবেন আগামী ১৩ জুলাই রাতে। ১৪ জুলাই সকালে রাজশাহীতে পৌঁছাবে। এরপর ১৫ জুলাই কিশোরের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে।

ডা. প্যাট্টিক বিপুল বিশ্বাস আরও বলেন, ১৫ জুলাই সকাল ৯টার দিকে মরদেহ সিটি চার্চে নিয়ে ধর্মীয় আচার শুরু করা হবে। সাড়ে ৯টায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। চলবে বেলা ১১টা পর্যন্ত। এন্ড্রু কিশোরের ইচ্ছা অনুযায়ী বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার মরদেহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে নেয়া হবে। সেখানে তার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ভক্তদের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে। এরপর এন্ড্রু কিশোরের মরদেহ রাজশাহী কলেজে রাখা হবে। সেখানেও ভক্ত-অনুরাগীদের শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে। শ্রদ্ধা জানানো শেষে বেলা সাড়ে ৩টায় এন্ড্রু কিশোরকে সমাধিস্থলে নেওয়া হবে। ডা. প্যাট্টিক বিপুল বিশ্বাস বলেন, কিশোরের পছন্দের একটি জায়গা তিনি আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন সেই পছন্দের জায়গাতে তাকে অনন্তকালের জন্য সমাহিত করা হবে।