শিশুরা চোখ খুলে দিয়েছে

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শিশুরা চোখ খুলে দিয়েছে

তৌফিকুল ইসলাম ১:১৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০১৯

print
শিশুরা চোখ খুলে দিয়েছে

আজ থেকে দুরন্ত টিভিতে প্রচার হবে মেধাভিত্তিক আন্তর্জাতিক কুইজ প্রতিযোগিতা ‘মাস্টারমাইন্ড ফ্যামিলি বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে নবনীতা চৌধুরী কথা বলেছেন তৌফিকুল ইসলামের সঙ্গে

দুরন্ত টিভির বিবিসি মাস্টারমাইন্ড অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার অভিজ্ঞতা বলুন।
দারুণ অভিজ্ঞতা। এই যে আমরা ঢালাওভাবে ভাবি আজকালকার শিশুরা পড়ালেখা করে না, মানে পড়ার বইয়ের বাইরে কিছু জানে না, কোনো বিষয়ে তাদের কৌতূহল নেই, জিপিএ-৫’র কথা ভাবতে ভাবতে তাদের আর দেশ, দুনিয়া, সাহিত্য, সংস্কৃতি কিছু সম্পর্কে জানার কোনো আগ্রহ বা উপায় নেই, এগুলো যে কত ভুল ধারণা সেটা এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দর্শক জানতে পারবেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র একটা আশাবাদের বাংলাদেশ পর্দায় ফুটে উঠবে। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে, ৮-১১ বছর বয়সী উজ্জ্বল ছেলেমেয়েদের সঙ্গে এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পেরে। আমার একরকম চোখ খুলে দিয়েছে শিশুরা। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের সংস্কৃতি এবং ইতিহাস সম্পর্কে জানবার গভীর আগ্রহ এবং এসব সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের গভীরতা দেখেও।

কুইজ শোটির হট সিটে শিশুদের নিয়ে প্রোগ্রাম করতে কেমন লেগেছে?
আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি যখন দেখেছি ঢাকার নামকরা দামি স্কুলের দুই শিশুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছোট শহরের সরকারি স্কুলে পড়া ভাইবোনেরা জিতে যাচ্ছে, আমার তখন মনে হয়েছে মেধার লড়াইয়ে জিতে যাওয়ার সুযোগের ন্যায্যতাটা শিশুরা টের পাবে এই অনুষ্ঠান দেখে। আমরাও আমাদের শৈশবে যখন ঢাকা শহরে বড় স্কুলে পড়েছি, আমরা আমাদেরই বাড়িতে, স্কুলে অনেক সময় সেরা ভেবেছি, তারপর আসলে জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা বা নতুন কুঁড়ির মতো অনুষ্ঠান করতে গিয়ে দেখেছি সারা দেশেই শিশুরা মা-বাবা শিক্ষকের সহায়তায় নিজেকে প্রস্তুত করছে। তখন নিজেকে আরও প্রস্তুত করার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। প্রতিটা ছেলেমেয়ে কী যে ঝকঝকে, কী আত্মবিশ্বাসী! ওদের নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টা কিন্তু আমি করিনি। আমি আসলে শিশুদের আমার আপনার মতোই আরেকজন ব্যক্তি বলে ভাবতেই ভালোবাসি, আমার শৈশবের স্মৃতি বলে, তখনো কেউ আমাকে বড় মানুষদের মতো সম্মান এবং গুরুত্ব দিয়ে কথা বললেই আমার ভালো লাগত। কাজেই আমি আসলে আমার মেয়ের সঙ্গে যেভাবে কথা বলি, অনুষ্ঠানের শিশুদের সঙ্গেও সেভাবে কথা বলেছি, আরেকজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির মতোই পূর্ণ সম্মান দিয়ে তাদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ ভেবেই। শিশুদের বরং দেখার চোখ আপনার আমার মতো ক্লিশে নয়, ওরা মুক্তমনে একটা বিষয় বিচার করতে পারে আর খোলামেলাভাবে তাদের মতো প্রকাশ করতে পারে, সেটা আমাদের জন্য বরং খুব শিক্ষণীয়।

পরিবারে বাবা-মাসহ অন্য সদস্যদের উপস্থিতিতে এরকম পারিবারিক কুইজ শো নিয়ে আপনার অনুভূতি...
আমার ভীষণ ভালো লাগার জায়গা তৈরি করেছে মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশ অনুষ্ঠানে এ ক্ষেত্রেও। এই অনুষ্ঠানটা যারা পুরো সিজন দেখবেন, তারা দেখবেন আমরা একটা ঢালাও অভিযোগ করি বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের যত্ন করছেন না, পারিবারিক বন্ধন ভেঙে পড়ছে এবং বাবা-মা ছেলেমেয়েদের জিপিএ-৫ পাওয়ার মেশিনে পরিণত করছেন, সেটা আসলে একটা ঢালাও অভিযোগ ছাড়া আর কিছু নয়। দেখবেন দাদা, নানি, চাচা, খালা, কাজিনদের সঙ্গে শিশুদের কী সুন্দর সম্পর্ক। বাবা-মায়েরা নিজেদের কাজ, সংসার সব কিছু সামলে ছেলেমেয়েদের সময় দিচ্ছেন, মাঠের অভাবে বাড়িতে নানারকম খেলার সুযোগ তৈরি করছেন, ছেলেমেয়ে উভয়কে নাচ, গান থেকে ক্রিকেট শেখার সুযোগ করে দিচ্ছেন। বাবা-মা নিজেরাই পড়াচ্ছেন ছেলেমেয়েদের, পড়ার বইয়ের বাইরে গল্পের বই কিনে দিচ্ছেন, দেশ সম্পর্কে বাড়িতে গল্প করছেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ফলেই আসলে ছেলেমেয়েরা এতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠছে। আমার কাছে আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার মনে হয়েছে, বাবা এবং মা দুজনেই কিন্তু শিশুদের বিকাশে ভূমিকা রাখছেন, দুজনেই দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং পরিবারে আসলে বাবা-মা সন্তান সবার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটা প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে। মানে বাবা বা মা একক সিদ্ধান্তে ছেলেমেয়েদের এই প্রতিযোগিতায় নিয়ে এসেছেন তা কিন্তু নয়, শিশুরা সিদ্ধান্ত নিয়ে হয় বাবা-মাকে বুঝিয়ে এনেছে অথবা বাবা-মা সিদ্ধান্ত নিয়ে শিশুদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বুঝিয়ে একসঙ্গে এসেছেন। অথবা বলতে পারি, যেসব পরিবারে এই সুস্থ পরিবেশটা তৈরি হয়েছে সেসব পরিবারের শিশুরাই আসলে ৬৪ সেরা পরিবারের এক পরিবার হয়ে এই অনুষ্ঠানের মূল পর্বে উঠে আসতে পেরেছিল।

এটা তো আন্তর্জাতিক প্রোগ্রাম, বাংলাদেশে কতটুকু জনপ্রিয়তা পেতে পারে বলে মনে করেন?
আমার তো প্রত্যাশা খুব জনপ্রিয়তা পাবে কারণ এতগুলো পরিবার, সেসব পরিবারের বাবা-মা শিশু আত্মীয়, মানে আমাদের মতোই আরও ৬৪টি পরিবারকে টেলিভিশনের পর্দায় চিনতে পারার সুযোগ তো এই প্রথম। আগে তো কখনো এই আকারের কোনো রিয়ালিটি শো হয়নি বাংলাদেশে। আর দর্শক দেখবেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার এই পরিবারগুলোর সবারই শিশুদের প্রতি যত্নে, তাদের একটা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নে, শিশুদের ঘিরে বিনিয়োগ আর প্রচেষ্টায় একটা ঐক্য আছে, সেটার সঙ্গে বাংলাদেশের বেশিরভাগ বাবা-মার পরিবারই একাত্মবোধ করবে, কাজেই এই অনুষ্ঠান দেখতে ভালো লাগবেই, শিশুদের তো বটেই পুরো পরিবারেরই। আর দুরন্ত টিভি যেভাবে অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছে, এমন সেট, লাইট, প্রস্তুতি নিয়েও আর কোনো টিভি শো তৈরি হয়েছে কি-না আমি জানি না। আর মাস্টারমাইন্ড পৃথিবীর যে দেশেই গিয়েছে চরম জনপ্রিয়তা পেয়েছে, একরকম ঝড় তুলেছে, বাংলাদেশেও সেটা না হওয়ার কারণ দেখি না।

টক শো উপস্থাপনা থেকে শিশুদের অংশগ্রহণে প্রোগ্রাম উপস্থাপনার বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলুন, দর্শক এর মাধ্যমে ভিন্ন আঙ্গিকে নবনীতা চৌধুরীকে দেখতে পাবে।
আমার আসলে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে, তাদের গল্প জানতে ভালো লাগে, আমি সাংবাদিকতাকে সেজন্যই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। টক শো করলে একজন সাংবাদিক হয়তো সে কাজটা পর্দার সামনে করেন; কিন্তু আসলে তো এটাই একজন সাংবাদিকের মূল দক্ষতা। রাজনৈতিক টক শোতে আমাদের তো অনেক রুঢ় বাস্তবতা, নেতিবাচকতা নিয়ে কথা বলতে হয়, অনেক সময় আমরা প্রত্যাশিত পরিবর্তনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার না দেখে হতাশ হই, সেখানে এই অনুষ্ঠান আসলে আমার ভেতরে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি করেছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন বিজ্ঞানী, নভোচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, পরিষ্কার সুন্দর শহর তৈরি করতে চাইছে, নদী, মাঠ রক্ষায়, শব্দ দূষণ কমাতে নিজেরা দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলছে এই ৮-১১ বছরের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা! ওদের বয়সে তো আমরা এভাবে ভাবতেই পারতাম না! তো আমাদের দেশটা যে এমন ভাবনার ছেলেমেয়ে তৈরি করতে পারছে সেটাই তো দারুণ খবর!

এবার ব্যক্তি নবনীতা চৌধুরীর কাছে আসি। আপনি অসাধারণ একজন সঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীত সাধনা নিয়ে বলুন...
অনেক ধন্যবাদ। জি সিরিজের সঙ্গে ‘আহারে সোনালি বন্ধু’ নামের যে অ্যালবামটির চুক্তি সই হয়েছে, সেটির গানগুলো আসলে একটি একটি করে মিউজিক ভিডিও করেই প্রকাশ করতে চাইছে এখন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে দুটো হাছন রাজার গান ‘সোনালি বন্ধু’ আর ‘রূপ দেখিলাম রে’ প্রকাশ পেয়েছে। দর্শকের ব্যাপক ভালোবাসাও পেয়েছে গানগুলো। রাধারমণ দত্তের গান ‘বল গো সখী’র মিউজিক ভিডিও আসছে খুব শিগগিরই। আর সময়-সুযোগ করতে পারলেই মঞ্চে এবং টেলিভিশনে লাইভ গান করছি।