থিয়েটার রক্তে মিশে গেছে

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

ক থা সা মা ন্য

থিয়েটার রক্তে মিশে গেছে

ছাইফুল ইসলাম মাছুম ৭:৫০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

print
থিয়েটার রক্তে মিশে গেছে

রূপান্তরিত নারী তাসনুভা শিশির। নাট্যকর্মী হিসেবে কাজ করছেন মঞ্চ নাটকে। নৃত্যশিল্পী হিসেবেও নাম কুড়িয়েছেন। সমসাময়িক ব্যস্ততা ও পথচলার গল্প নিয়ে কথা  বলেছেন ছাইফুল ইসলাম মাছুমের সঙ্গে

বর্তমানে কী কী করছেন? 

আমি একজন নাট্যকর্মী ও নৃত্যশিল্পী। এখন কাজ করছি নাট্যদল বটতলায়। কলকাতায় একটা শর্ট ফিল্মে কাজ করব তার জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছি।

আপনি একই সঙ্গে নৃত্যশিল্পী ও মঞ্চের অভিনেত্রী। কোন পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
নাচটা আসলে একদম ছেলেবেলা থেকেই করি আর থিয়েটার ২০০৬ থেকে। দুইটা মাধ্যম দুই রকম। তবে নিজেকে নাট্যকর্মী বলে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

মঞ্চ নাটকের সঙ্গে আপনার শুরুটা কীভাবে?
মঞ্চের সঙ্গে শুরুটা ২০০৬ সাল থেকে। তখন আমি উচ্চমাধ্যমিকে পড়ি। নাচ করতাম নারায়ণগঞ্জে আদম স্যারের কাছে। প্রোগ্রামগুলো হতো হয় জিয়া হল না হয় চুনকা পাঠাগারে। ওখানে রিহার্সেল করতে গেলেই দেখতাম রুমের মধ্যে বসে অনেকেই একসঙ্গে মহড়া করতেন, বাইরে থেকে দেখতাম। খুব ভালো লাগত। একদিন কলেজের ওয়ালে লিফলেট দেখলাম, নাটুয়া নাট্যকর্মী খুঁজছে। ওভাবে ধীরে ধীরে মঞ্চ নাটকের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। সেই থেকেই কেমন করে যেন রক্তে মিশে গেছে থিয়েটার। নাট্যদল নাটুয়ায় কাজ করার পর দেখলাম, এটা নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক দল। আমার ইচ্ছাটা অনেক বেড়ে গেল, নাটকের প্রতি ক্ষুধাটাও বেড়ে গেল। এরপর ঢাকায় একটা বড় নাটকের দলে কাজ করার সুযোগ এলো ২০১২ সালে।

নৃত্যে আপনি বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
নাচটা আসলে প্রাণের খোরাক, ভীষণ ভালো লাগে। যখন মঞ্চে নাচি অনেক ডিপ্রেশন কমে যায়। নাচের অর্জন অনেক। অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। ছেলেবেলায় সবসময় বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম হতাম। শাপলা কুঁড়ি ২০০৩, জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা এরকম নানা প্রোগ্রামে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। কিন্তু ছেলেবেলা শেষ হতে হতেই সে সব অর্জনগুলো ম্লান হতে থাকে।

পথ চলতে গিয়ে কোন স্ট্রাগলের গল্প আছে?
আসলে এগুলো অনেক কথা। জীবনে অনেক ব্যথা, অনেক স্ট্রাগল। তারুণ্যে নিজের শরীরের ভেতর জানান দিচ্ছিল আরেকটা শরীর। সে সব তিক্ত স্মৃতি। জীবনের চলার পথটা কখনোই মসৃণ নয়। এত এত যুদ্ধ সেখানে স্ট্রাগল নেই, কোথায় সেটাই খুঁজছি। ঘর ছাড়তে হয়েছিল ৭ বছর আগে। পরিবার ছাড়া বড় হয়েছি। মাস্টার্স শেষ করেছি আমার কিছু শিক্ষকের সহায়তায়।

আপনি ব্যক্তিজীবনে একজন রূপান্তরিত নারী। পথ চলতে কেমন সমস্যায় পড়তে হয়?
ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার কারণে নানান ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছি। কিন্তু থিয়েটারে কাজ করতে গিয়ে তেমন সমস্যায় পড়িনি। বটতলায় কাজ করতে গিয়ে কখনো নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার মনে হয় না, নিজেকে শিল্পী মনে হয়। প্রতিটা মানুষ আমায় যেমন শ্রদ্ধা করে সেরকম ভালোবাসে, আমিও চেষ্টা করি সবার এই ভালোবাসাটা বজায় রেখে সম্মানটুকু নিয়ে বাঁচতে। আসলে বটতলা শুধু আমার থিয়েটার দল-ই না আমার পরিবার।

আপনার অর্জনগুলো জানতে চাই।
জীবনে যেমন অনেক কিছু হারিয়েছি, আবার অনেক কিছু অর্জনও করেছি। সম্প্রতি সাংগাত ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্ক থেকে এক মাসের স্কলারশিপ পেয়ে নেপালে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ট্রেনিং করলাম। একটা আন্তর্জাতিক সিনেমায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আমি মনে করি মাস্টার্স শেষ করতে পেরেছি, এটা আমার জীবনের জন্য অনেক কিছু। বটতলার মতো একটা মেইনস্ট্রিম দলে একজন নাট্যকর্মী হিসেবে কাজ করছি। এটাও অনেক।

আপনার স্বপ্নের কথা বলুন।
নিজের এবং নিজের কমিউনিটির মানুষের উন্নতির জন্য কাজ করতে চাই। আসলে মেইনস্ট্রিমিংটা খুব দরকার। আমি মূলত আমার কমিউনিটির মেইনস্ট্রিমিংয়ের জন্য কাজ করতে চাই। সবাই মানুষ। কাজ করার জন্য বা তার সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তার জেন্ডার কোনো বাধা হতে পারে না।