আপনার শেকড়কে কখনোই ছিঁড়তে পারবেন না

ঢাকা, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ক থা সা মা ন্য @ খোলা কাগজ

আপনার শেকড়কে কখনোই ছিঁড়তে পারবেন না

তৌফিকুল ইসলাম ৮:১৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০১৯

print
আপনার শেকড়কে কখনোই ছিঁড়তে পারবেন না

কাজী নওশাবা আহমেদ অভিনীত স্মারক নাটকটি ঈদের আগের দিন রাত ১০টায় নাগরিক টিভিতে প্রচার হবে। এর মাধ্যমে এক বছর পর তিনি ছোটপর্দায় অভিনয়ে ফিরলেন। এছাড়া সম্প্রতি ফরগটেন রুটস নামে একটি রিয়েলিটি শো উপস্থাপনা করেছেন। এ অনুষ্ঠানটি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন তৌফিকুল ইসলামের সঙ্গে

ফরগটেন রুটসের কাজ তো শেষ করলেন...
হ্যাঁ, গত মাসের ১৫ তারিখে ফরগটেন রুটসের কাজ শেষ হয়েছে।

এ কাজটা নিয়ে বলুন...
ফরগটেন রুটস নামটার মধ্যেই আসলে সব আছে। মানে যারা শেকড় ভুলে গেছে। আসলে ভুলে তো কেউ যায় না, যেটা হয় সময় অথবা স্থানের একটা প্রেশার পড়ে যে আমি কোথায় আছি? কেন আছি? সেভাবে একটা প্রেশার কন্টিনিউয়াসলি পড়তে থাকে। এ অনুষ্ঠানের প্রথম একটা সিজন ছিল, এটা কিন্তু সেকেন্ড সিজন। ফার্স্ট সিজনে আমি ছিলাম না, তখন সবাই লন্ডন বেজড ছিল।

উপস্থাপনার ক্ষেত্রে...
সেকেন্ড সিজনে তারা বাংলাদেশের একজনকে খুঁজছিল। পরে আমাকে যখন বলল, সত্যি কথা বলতে উপস্থাপনার ব্যাপারটা আমার কাছে খুব কঠিন একটা বিষয়। অভিনয়ের চাইতেও উপস্থাপনা কঠিন লাগে। প্রথম কারণ হচ্ছে উপস্থাপককে সব সময় এ জগতে থাকতে হয়। যেটা আমার জন্য খুব ডিফিকাল্ট। এ জগতে থাকা বুঝতে পারছেন তো? মানে উপস্থিত থাকতে হয়। আমি তো প্রায়ই হারিয়ে যাই। এ কারণে আমার জন্য উপস্থাপনা করা খুবই ডিফিকাল্ট। আর খুব ফরমালি উপস্থাপনা করাটা আরও ডিফিকাল্ট। মানে এক জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হলো, আমি কিছু কথা বলব। যেটা সাধারণত আমার ক্ষেত্রে হয় না।

শিশুদের অনুষ্ঠান তো আগেও উপস্থাপনা করেছেন...
শিশুরা খুব চঞ্চল, আর ওদের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করতে আমিও খুব পছন্দ করি। আমি এ কারণেই দুরন্ত টিভির একটা কাজ করি স্বপ্ন আঁকার দল, সেটা করতে আমাকে বেগ পেতে হয় না। আমি খুবই ইনজয় করি। দুরন্ত টিভিতে কাজ করার আনন্দই এটা যে, প্রথম কথা হচ্ছে শিশু আর দ্বিতীয়ত বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করতে আমার কোনো টায়ার্ডনেস ফিল হয় না। কোনো ফরম্যাট নেই, ফরম্যাটহীন একটা কাজ, দৌড়াদৌড়ি, ঝাঁপাঝাঁপি, মজা এই তো। আর থাকে না যে একটা প্রোপার বিষয় নেই, এভাবে কথা বলতে হবে ওভাবে কথা বলতে হবে। আমার জন্য ওটা খুবই সহজ, আর খুব আরামদায়কও বটে।

এ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে...
যখন ফরগটেন রুটসের ব্যাপারটা আসছে তখন ভয় পেয়েছিলাম। আমি কেন ভাই? আমি তো... যখন প্রোডিউসার আমাকে খুব সুন্দর করে বলেছিলেন, না, নওশাবা আমরা এমন কাউকে চাচ্ছি যে কি না দেশকে অনেক ভালোবাসে অথবা যার মধ্যে সে উদ্দীপনাটা আছে মানে যে কিনা আমাদের খুব উৎসাহ নিয়ে ঢাকা শহরটা দেখাবে। আমরা ওই রকম কাউকে খুঁজছি। তখনই আমার ভালো লাগছে, আমার দ্বিতীয় কথা হচ্ছে এমন দশটা বাচ্চা এসেছিল যাদের বয়স ১৬ থেকে শুরু করে ম্যাক্সিমাম ২০। একেবারেই বয়ঃসন্ধি টাইমটা, আর তারা কখনোই বাংলাদেশে আসেনি। তাদের কারও মা বিদেশি, বাবা বিদেশি অথবা দুজনই বিদেশি। মানে ওখানেই তাদের জন্ম হয়েছে, ওখানেই তাদের বেড়ে ওঠা। দেখা গেছে যাদের বাবা-মাও কখনো বাংলাদেশে আসেনি।

কেমন অনুভূতি ছিল সেটা...
আমার কাছে মনে হচ্ছিল একেবারে দশটা নবজাতক কাউকে আমার হাতে দেওয়া হয়েছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে আমি নিজেও কিন্তু ব্যস্ততার কারণে হোক অথবা জ্যামের কারণে হোক আমাদের ঐতিহ্যময় জায়গাগুলোতে যাই না। যেমন লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল এ জায়গাগুলোতে তো সেইভাবে যাওয়া হয় না। আবার স্মৃতিসৌধ কিংবা ধারেকাছেও কিন্তু যাওয়া হয় না। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ও দেখেছি শহীদ মিনারে আল্পনা আঁকা ছাড়া কিন্তু সেইভাবে যাওয়া হয় না। ফরগটেন রুটসের এ ১৫টা দিন আমি আরেকবার দেশের প্রেমে পড়েছি। আরেকবার ঝালাই করা, আরেকবার মুক্তিযুদ্ধকে জানা বা মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে যাওয়া, এই যে ছোট ছোট বিষয়গুলো যেগুলো ব্যস্ততার কারণে মাথা থেকে চলে যায় সেগুলো আবার ফিরে আসা মানে রীতিমতো আমার কাছে রিভাইভ হয়েছে।

অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা...
এতে এক অন্য ধরনের পার্সোনাল আনন্দ আমি পেয়েছি। আরেকটা আনন্দ হচ্ছে যে, এতগুলো বাচ্চাকে ঐতিহ্য সম্পর্কে জানানো, বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, মজা করা। শুধু মজা না কি পরিমাণ চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে যে তাদের যেতে হয়েছে। প্রচুর চ্যালেঞ্জ ছিল, যেহেতু এটা রিয়েলিটি শো। দশজন পার্টিসিপেট করবে, তার মধ্যে যে বেস্ট হবে তার জন্য একটা গিফট আছে। প্রতিদিন তাদের একটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করা এবং সে চ্যালেঞ্জকে জেনেও না জানার ভান করা, ২৪ ঘণ্টা ওদের সঙ্গে থাকা, ওদের বার্থডে পালন করা, ওদের সুখ-দুঃখ, কান্নাকাটি, ঝগড়াঝাটি সবকিছু কাছ থেকে দেখা। আমি নিজে কখনো লন্ডনে যাইনি। সো, লন্ডন সম্পর্কে আমারও অনেক আগ্রহ আছে যে ওখানকার মিউজিয়াম কেমন, ওখানে সিলেটিরা কি করে, থিয়েটারটা কি রকম হয়, মানে এখানে একটা এক্সচেঞ্জ হয়েছে। দেখা গিয়েছিল যে আমিও লন্ডন সম্পর্কে জানি না, ওরাও বাংলাদেশ সম্পর্কে জানে না।

অন্যান্য জার্নি প্রসঙ্গে...
ওদেরকে নিয়ে আমি শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়েছি, ওদের নিয়ে পুরনো ঢাকার বাকরখানির দোকানে গিয়েছি, ফুলের বাজারে গিয়েছি। শুধুমাত্র যে ওদের জন্য জায়গাগুলোতে যাওয়া হয়েছে তা না। তারপর রিকশা কীভাবে চালাতে হয়, যারা রিকশাচালক তাদের কাছে গিয়েছি, অন্যরকম একটা জার্নি হয়েছে আমার।

সব মিলিয়ে আপনার কেমন লেগেছে?
ওই যে বললাম ব্যক্তিগতভাবে আমি নওশাবা আরেকবার আমার কিশোরী বয়সে ফিরে গিয়েছি। যখন আমার বাবা আমাকে নিয়ে শহীদ মিনারে যেতেন, স্মৃতিসৌধে যেতেন মানে তখন আমার মনে হচ্ছিল একজন বাবা অথবা মায়ের যে কতখানি প্রভাব কাজ করে, এই জায়গাগুলোতে যাওয়া যে কত ইম্পর্ট্যান্ট। আপনার শেকড়টা আসলে তখনই সৃষ্টি হয়। আপনি যতই দূরে যান না কেন, আপনার শেকড়কে কখনোই ছিঁড়তে পারবেন না। গেলে কিন্তু আপনি মারা যাবেন। দেখবেন তখনি আপনার গাছের পাতাটা আস্তে আস্তে হলুদ হওয়া শুরু করবে, তারপর আপনি ঝরে পড়ে যাবেন। আপনি পৃথিবীর যেখানেই যান না কেন।

শেকড়ের সন্ধানের অনুভূতি...
বেসিক জায়গাটা আমি আরেকবার রিয়েলাইজ করেছি কতটা জরুরি শেকড়টা ঠিক রাখা, শেকড়টাকে পানি ঠিকমতো দেওয়া। এটা হলেই একটা গাছ অনেক দিন বাঁচে, একটা গাছ বটবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে; এগুলো ফ্যাক্ট। বাঙালি জাতিকে যদি বাঁচিয়ে রাখতে চান, আপনাকে নিউ জেনারেশনের দিকে তাকাতে হবে। আমরা তো যে কোনো সময় ঝরে পড়ে যাব। একটা নিউ জেনারেশন যদি ঠিকঠাক পানি পায়, মাটি পায়, আলো পায়। তাহলে তো সে এ গাছকে টিকিয়ে রাখবে। বাঙালি জাতিকে ইতিহাসের পরিক্রমায় এগিয়ে নিয়ে যাবে। পেছনের দিকে তাকালে দেখতে পাবেন মেসোপটেমিয়া সভ্যতা থেকে শুরু করে অন্যান্য সভ্যতায় প্রচুর জাতি হারিয়ে গেছে। এক সময় মিসর কোথায় ছিল। এ জাতির গল্পগুলোকে যদি কোনোভাবে তুলে ধরা যেত, যদিও এখন টেকনোলজির কারণে কোনো কিছু আবিষ্কার হলে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে হাজার হাজার ফোন চলে যায়, স্যাটেলাইট চলে যায়, তবুও শেকড়কে আশ্রয় করেই এগোতে হবে।

রিয়েলিটি শোটি কোন চ্যানেলে প্রচার হবে?
এখনো ঠিক হয়নি, শুটিং শেষ হলো খুব বেশি দিন তো হয়নি। এখন এডিটিং হবে, আই গেস এই বছরই অনএয়ার শুরু হওয়ার কথা। বাট কোন চ্যানেলে যাবে সেটা আমি এখনো জানি না।

সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
আপনাকেও ধন্যবাদ।