বানভাসিদের পাশে এগারজন

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

বানভাসিদের পাশে এগারজন

আবু বকর সিদ্দীক ৬:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০১৯

print
বানভাসিদের পাশে এগারজন

বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছে জামিলা বেওয়া। সামনের দিকে ঝুঁকে হাতে লাঠি নিয়ে সে পথ চলে। চোখে চশমা ওঠেনি, তবে আগের মতো সব কিছু স্পষ্ট দেখে না। বছর বিশেক আগে তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে চলে গেছে তার স্বামী, সে সময় থেকে সব কিছু আগলে রেখে সব কিছু সামলে আসছে সে। জামালপুর জেলার ভাঙ্গনকবলিত ইসলামপুর ইউনিয়নে তাদের বাড়ি। এবারের বন্যায় সব হারিয়েছে। জেলার শরিফপুর ইউনিয়নে সরকারি জায়গায় আশ্রয় নিয়ে এক ছেলে, দুই স্কুল পড়ুয়া নাতি আর বউমাকে নিয়ে বসবাস করছে।

আগস্টের ২১ তারিখে আমরা সেখানে ত্রাণ দিতে গেলে দেখা মেলে। শরিফপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলমের দেওয়া একটি কাগজ যত্ন করে আঁচলে বেধে রেখেছেন। লাঠির ভরের সঙ্গে তাকে চলতে সহযোগিতা করছে আট বছরের নাতনী কাজলী। শ’দুয়েক মানুষের মাঝে বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা দুপুরে সেখানে যায়।

এ বছর বর্ষার শুরুতেই ভারী বৃষ্টি আর উজানের পানিতে বন্যা দেখা দেয় ১৫টিরও বেশি জেলায়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। দেখা দেয় খাদ্য, পানি, ওষুধের সংকট। সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেই বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ায় দৈনিক খোলা কাগজের পাঠক ফোরাম এগারজন। কেন্দ্রীয় এ উদ্যোগে সাড়া দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এগারজন-এর সদস্যরা সংগ্রহ করেন ত্রাণ। ত্রাণ তহবিলে সাড়া দেন ছাত্র-শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। খোলা কাগজ পরিবারও বাড়িয়ে দেয় সহযোগিতার হাত।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ঈদের আগে ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা থাকায় আমরা সময়টা বেছে নিই ঈদের পর। যাত্রা শুরুর আগের দিন খোলা কাগজের অফিস থেকে সম্পাদক আমাদের হাতে ত্রাণের জন্য সংগ্রহীত নগদ টাকা তুলে দেন। অফিস থেকে সিনিয়র রিপোর্টার জাফর আহমদ, স্টাফ রিপোর্টার ছাইফুল ইসলাম মাছুম, স্টাফ রিপোর্টার হাসান ওয়ালী, সহ-সম্পাদক শফিক হাসান, সার্কুলেশন ম্যানেজার লিটন আক্তার, বিজ্ঞাপন ম্যানেজার ওমর ফারুক, গ্রাফিক্স ডিজাইনার জাবেদ হোসেনসহ ভোরে জামালপুরের উদ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করি।

দুপুরে জামালপুর পৌঁছালে সেখানকার এগারজনের টিম আমাদের বরণ করেন। জামালপুর ‘এগারজন’-এর সভাপতি রেজুয়ান রহমান মুবিন, সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সাকিব হোসেন জয়সহ অন্যরা গত কয়েকদিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তারা এলাকায় ঘুরে ঘুরে হতদরিদ্র ও সত্যিকারের ক্ষতিগ্রস্ত গরিব পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করেছেন। জামালপুর প্রতিনিধি মিঠু আহমেদের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকা তৈরি করা হয়।

শরিফপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ত্রাণ প্রত্যাশীদের চোখে মুখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। কাউকে কাউকে দেখলাম, মাথা নত করে বসে আছে। নারী ও পুরুষদের আলাদা আলাদা বসার ব্যবস্থা, গ্রাম পুলিশ ও চেয়ারম্যানের লোকজন আন্তরিকভাবে তাদের শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করছেন। কিছুদিন আগের তুমুল বৃষ্টি ভুলিয়ে প্রকৃতি বেশ গরম। ভরদুপুরে তপ্তরোদ, তবে ইউনিয়ন পরিষদ গাছের ছায়ায় ঢাকা। মুখ লুকিয়ে থাকা ত্রাণ নিতে আসা মানুষগুলো হেরে গেছে প্রকৃতির কাছে। বন্যার আগ্রাসে তারা বাড়ি-ঘর ফসল হারিয়েছে।

সব হারানো মানুষগুলোর সামনে খুব অসহায় লাগছিল। প্রথমবার মনে হলো, আর একটু চেষ্টা করে, সামর্থবানদের অনুরোধ করে এ সহায়তার তালিকাটা বাড়াতে পারলে ভালো হতো। সত্যিকার অর্থেই চাল চুলোহীন মানুষগুলোর চেহারা দেখে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

ত্রাণ কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে আমি বরাবরই গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আসছি এগারজনের নেতৃবৃন্দের প্রতি। সারা দেশ থেকে তারা ত্রাণ তুলেছেন। বিশেষ করে প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এ কাজে অগ্রনি ভূমিকা পালন করেছেন।

জামিলা বেওয়ার সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে আরও শতাধিক বয়স্ক নারী, পুরুষও আছে শ’খানেক। বেশ কয়েকজন প্রতিবন্ধীও রয়েছেন তালিকায়। চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা পেয়ে আমরা মুগ্ধ। শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের ত্রাণ বিতরণ সম্পন্ন করতে জেলার অন্য সংবাদকর্মিসহ অনেকেই ছুটে এসেছিলেন।

আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন খোলা কাগজের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি ইদ্রিস আলী, ইসলামপুর প্রতিনিধি ওসমান হারুনী, বকশীগঞ্জ প্রতিনিধি রকিবুল হাসান, সরিষাবাড়ী প্রতিনিধি আবদুল রাজ্জাক, দেওয়ানগঞ্জ প্রতিনিধি মো. খাদেমুল ইসলাম।

শরিফপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, এগারজন ও খোলা কাগজ পরিবারের সদস্যরা ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে উপস্থিত ত্রাণপ্রার্থীদের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ করেন।

সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এ উদ্যোগকে চেয়ারম্যান সাধুবাদ জানান। খোলা কাগজের পক্ষ থেকে এ আয়োজন সফল করতে যারা অনুদান দিয়েছেন, যারা নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

সাধারণ সম্পাদক
এগারজন কেন্দ্রীয় কমিটি