তুমি

ঢাকা, রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯ | ২ ভাদ্র ১৪২৬

তুমি

আমেনা আক্তার প্রিয়া ৩:৫৮ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৯

print
তুমি

ঘুম ভাঙতেই দু’জন দু’জনকে শুভ সকাল বলা, ক্লান্ত দুপুরে খাবারের কথা জিজ্ঞেস করা, দিগন্তের কোলে ঢলে পড়া নিস্তেজ বিকালে মুঠোফোনে খানিকটা আড্ডা দেওয়া, আর নির্জন মধ্যরাতে কথা বলে রাত ভোর করা ছাড়া জীবন ছিল একেবারেই অচল।

কখনো তোমার কবিতা- কখনো আমার গান, কখনো আমার গল্প-কখনো তোমার গল্প এইসব নিয়েই চলতো আমাদের আড্ডা। আমার শিউলিতলার ফুলের ছড়াছড়ি, গফফু খরগোশ ছানাটার ছোটাছুটি, পুষি বিড়ালটার দৌড়াদৌড়ি, জানালার কাচে বৃষ্টির দাপাদাপি, বইয়ের পাতার পুরনো গন্ধ, চুড়ির রিনিঝিনি শব্দের মুগ্ধতার গল্প থেকে শুরু করে তোমার গিটারের টুংটাং, তোমার পথকলিদের ভালোবাসা, তোমার ফটোগ্রাফির দারুণ দক্ষতা, জ্যোৎসা রাতে তোমার হিমু হওয়ার গল্প, তোমার দেখা শ্রমিকটার ঝরে পরা ঘামের কষ্ট.... কোনো কিছুই বাদ পড়তো না।

তোমার চোখে চোখ রাখার খেয়ালে আমি হতাম লজ্জাবতী লতা, ধীরে ধীরে আমি হলাম হেসে খলখল- গেয়ে কলকল। রেস্টুরেন্টে মৃদু আলোয় লজ্জাবনত হয়ে লাচ্ছি খাওয়ার তৃপ্তি, মাঝেমাঝে আড়চোখে তোমাকে দেখার শান্তি, পরম নির্ভরতায় রেললাইন ধরে পাশাপাশি হেটে যাওয়ার সাহস, টঙ দোকানে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে ফুঁ দেওয়ার আনন্দ, একসঙ্গে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার ভাবনাতে হারিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা নিয়ে তো আমরা ভালো ছিলাম, ভীষণ ভালো ছিলাম। কিন্তু রেললাইনের একপ্রান্ত অপর প্রান্তকে কোনোদিন ছুঁতে না পারার কবিতাটা আমাদের জীবনে কেমন করে যেন সত্যি হয়ে গেল। সত্যিই আমরা কেউ কাউকে ছুঁতে পারলাম না। রেললাইনের মতো না পাওয়ার চরম আক্ষেপ নিয়ে আমরা দুজন দু’প্রান্তে চলতে লাগলাম।

তোমার ব্যস্ততা আর আমার অভিমানের ঢেউয়ে আমাদের ভালোবাসার পাল তোলা ছোট্ট নৌকাটা কখন যে মাঝ সমুদ্রে খাবি খাচ্ছিল তা জানতেই পারলাম না। আর যখন জানলাম তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। কিন্তু দেরি হলেও যে সংশোধনের সুযোগ থাকে তা তুমি বুঝতেই চাইলে না। তোমার একঘেঁয়েমি আর জিদের কাছে স্তব্ধ হয়ে গেল আমার সব আকুতি-মিনতি। আমার আর্তনাদ ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে নিজের কানে ফিরে এসেছিল বারবার, আমার কান্নারা গলার ভেতর দলা পাকিয়ে বসেছিল দিনের পর দিন, আমার নির্ঘুম রাত্রিগুলো শুধু দীর্ঘতর হয়েছিল আক্ষেপের নিদারুণ যন্ত্রণায়।

সময় গড়ালো। সেই সঙ্গে বদলে গেলাম চিরচেনা আমি-তুমি আর আমাদের তিল তিল করে গড়ে ওঠা অভ্যাসগুলো। আমার চোখের পানিও এক সময় থেমে গেছে, দূরে সরে গেছে স্মৃতিময় অতীত।

আশা-নিরাশার দোলাচলে ধীর লয়ে বিলীন হয়ে গেছে ভবিষ্যতের সাজানো স্বপ্ন। তোমাকে নিয়ে সূর্যোদয় দেখার সাধ এই জন্মে পূরণ হলো না, জ্যোৎসা রাতে তোমাকে পাশে নিয়ে অনন্ত সময় আমার আর পার করা হলো না, তোমার ঘরে ফেরার অপেক্ষায় আমাকে আর অধৈর্য হতে হলো না, তোমার হাতে আমার খোঁপায় মালা জড়ানো হলো না, দুই গাছি চুড়ি পড়ার জন্য আমার আর হা-পিত্যেশ করা লাগে না, তোমার জন্য আজ আর চোখে কাজল দেওয়ার ব্যস্ততা নেই, ইচ্ছে করেই টিপটা আর ভুল জায়গায় পরা হয় না। এক জনমে এত আক্ষেপের রক্তক্ষরণ নিয়ে আজ পাকা চুলে-মোটা ফ্রেমের চশমার ফাঁকে খুব জানতে ইচ্ছে করে আমায় ভুলে সুখী তুমি হয়েছ কত?

সদস্য
এগারজন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ