আইজুদ্দিন থেকে আয়েশা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

আইজুদ্দিন থেকে আয়েশা

সাইদ রহমান ১০:১৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৮

print
আইজুদ্দিন থেকে আয়েশা

ক্ষমতার সুতো যখন রাষ্ট্রের সব অঙ্গে বেড়ি পরায়, যখন ক্ষমতার আস্ফালনে খাবি খায় ক্ষমতাহীন উলুখাগড়ারা, প্রতিবাদের পথ রুদ্ধ হতে হতে যখন মিইয়ে যায় সব কণ্ঠস্বর, তখন শেষ সুড়ঙ্গটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসেন ‘গেরিলা আর্টিস্ট’রা। একমাত্র সম্বল হিসেবে দেয়ালের গায়ে ভর দিয়ে কথা বলতে শুরু করেন তারা। কথা বলেন ক্ষমতাহীনের হয়ে, জালেমের বিরুদ্ধে কথা বলেন মজলুমের হয়ে।

প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে দেয়াল লিখন বরাবরই জনপ্রিয়। কারণ সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অব্যক্ত ভাষাগুলো প্রতিধ্বনিত হয় এ দেয়াল লিখনে। হাল আমলে এটি আরও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে প্রায়-ই দেখা যায় নানা প্রতিবাদের ভাষা। দেয়ালে আঁকা অক্ষরগুলো শব্দ করে না বটে, কিন্তু ওই নৈঃশব্দের শক্তি যে কতটা, তা বোঝা যায় সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়ায়।

নব্বইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন দেয়ালে ‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিন’ লেখাটি সাধারণ মানুষের মনে দাগ কেটেছিল খুব। এখনো সে প্রজন্মের মানুষরা দুঃখ-দুর্দশায় পড়লে সেই কষ্টের ফেরিওয়ালা আইজুদ্দিনের কথা স্মরণ করেন। পরের দশকে আমরা দেখেছি, ‘অপেক্ষায় নজির’। অজ্ঞাত নজির হয়তো কোনো ভালো সময়ের অপেক্ষা করতে করতে মলিন হয়ে গেছেন। তারপর সুবোধের গ্রাফিতির কথা তো আমাদের সবারই জানা।

দিন কয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের দেয়ালের দুটি লেখা তুমুল আলোচনার সৃষ্টি করেছে। একটিতে লেখা আছে, ‘লাশটা এই ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েন ১০/ই/৩ মধুবাগ। অপেক্ষায় আছে মা।’

উল্লেখ্য, দেয়ালের ঠিকানাটি ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে অনশনকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম ইনস্টিটিউটের ছাত্র ওয়ালিদ আশরাফের বাড়ির ঠিকানা। আরেকটি দেয়াল লিখন এমন, ‘লাশের ভার বহন করতে পারবি তো।’ স্বাভাবিকভাবেই কে বা কারা এসব লিখেছেন, তা জানা যায়নি।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের গেটে দেখা গেল নতুন দেয়াল লিখন, ‘কষ্টে আছে আয়েশা আক্তার’। পাশে লাল কালিতে লেখা ‘প্রশ্ন ফাঁস’। নব্বইয়ের দশকের আইজুদ্দিনের বুকে কী কষ্ট ছিল সেটি অস্পষ্ট হলেও আজকের আয়েশার কষ্ট বুঝতে বেগ পেতে হয় না। উপরন্তু পাশেই যখন লাল কালিতে লেখা ‘প্রশ্ন ফাঁস’ শব্দ দুটি, তখন তো নয়-ই।

এখানে ‘ব্যক্তি’ আয়েশা কে, তা খুঁজতে যাওয়া বোকামি। আয়েশা হলো এদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতীক। যারা যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার টেবিলে বসার পরও প্রতিযোগিতায় হেরে যান তাদের কাছে, যারা পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করেছে, টাকা দিয়ে পরীক্ষার আগেই কিনে নিয়েছে প্রশ্নপত্র। এ নিয়ে আয়েশা প্রতিবাদ করেছে, রাস্তায় নেমেছে, গণমাধ্যমে কথা বলেছে কিন্তু কোনো প্রতিকার পায়নি। ক্ষমতার কাছে আয়েশার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে মিলিয়ে গেছে। তাই এবার আয়েশা তার কষ্টের কথা এঁকে দিয়েছে দেয়ালে।

হতে পারত রহিম কিংবা করিম, তা না হয়ে আয়েশা কেন? এমন প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়েদের হলের গেট বলেই হয়তো এমন প্রতীকী নারীর নাম। আবার হতে পারে নারীকে এখানে ভাবা হয়েছে দুর্বলের প্রতীক হিসেবে, যে শত চিৎকার করেও প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে পারেনি।’

সেটা যা-ই হোক, আয়েশার এ কষ্ট যদি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের একটুও ছুঁয়ে যায় তাহলেই স্বার্থক হবে এ দেয়াল লিখন।