ইমেজ সংকটে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

ইমেজ সংকটে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

দেবাশীষ দত্ত, কুষ্টিয়া ১০:১৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৭, ২০২০

print
ইমেজ সংকটে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

অনিয়ম, দুর্নীতি আর কেলেঙ্কারির ঘটনায় ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র বলছে বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে ইমেজ সংকটে পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য বিষয়ে একাধিক ফোনালাপের অডিও ক্লিপ এখন সবার হাতে।

মেগা প্রকল্পের আড়ালে দুর্নীতি আর বিধি লঙ্ঘন করে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীসহ দুই শতাধিক লোককে ডে-লেবার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা এখন বহুল আলোচিত। উপাচার্য সিন্ডিকেটের প্রধান হোতা সাবেক প্রক্টর মাহবুবর রহমানসহ প্রায় এক ডজন শিক্ষক-কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে উপাচার্যের মদদপুষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের এই সিন্ডিকেট গত তিন বছর ধরে নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছে। এদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে কৌশলে নামমাত্র তদন্ত কমিটি করে তাদের বহাল তবিয়তে রাখা হয়।

বর্তমান উপাচার্যের আমলে ঘটে যাওয়া সব অনিয়ম, দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত দাবির পাশাপাশি কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক সংগঠন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও কর্মকর্তা সমিতি থেকে শুরু করে অন্য প্যানেল জয়ী হয়ে এলেই ভিসি ও সাবেক প্রক্টর জামায়াত-বিএনপি আর জাসদ সমর্থকদের নিয়ে পাল্টা কমিটি গঠন করে দেন। ৪ বছরে ইবিকে তলানিতে নিয়ে গেছেন তারা। উন্নয়নের আড়ালে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শিক্ষক নিয়োগ, ডে-লেবার নিয়োগ, কেনাকাটায় কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। যার বহু প্রমাণ রয়েছে।’

ইবি শাপলা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সিনিয়র শিক্ষক প্রফেসর ড. মুঈদ রহমান বলেন, ‘আসকারী আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ৩০ বছর আমি ও একসঙ্গে ছিলাম। ভিসি হিসেবে আসার পর এক বছর ভালো ছিল। এরপর সে একটি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। কেন সে জিম্মি হয়ে পড়ল সে-ই ভালো বলতে পারবে। প্রথম বছর তাকে সবাই সমর্থন দিয়েছিল। আর এখন, তাকে ৭০ ভাগ লোক পছন্দ করে না। সে মন্দ লোক বলেই তাকে পছন্দ করে না।

শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য

বর্তমান উপাচার্যের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৬৫ জন। এ নিয়োগে বড় অংকের ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। গত ৪ বছরে নিয়োগ বাণিজ্যের ব্যাপারে ফোনালাপের অন্তত ৫টি অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়েছে। এর প্রতিটির সঙ্গে উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ জন বলে পরিচিত ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক ড. রুহুল আমিন, ইলেক্ট্রনিক বিভাগের শিক্ষক এস এম আব্দুর রহিম ও সাবেক প্রক্টর ড. মাহবুবর রহমানের সম্পৃক্ততা এসেছে। ফাঁস হওয়া ফোনালাপের অডিও ক্লিপে তাদের কথোপকথন উঠে এসেছে। প্রতিজন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ২০ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

সর্বশেষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে আরিফ হাসান খান নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর কাছে এই তিন শিক্ষক ২৮ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে অর্থের পরিমাণ কমিয়ে ১৮ লাখ টাকা করা হয়। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় আরিফের সব যোগ্যতা থাকার পরও তাকে পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। প্রতিকার ও বিচার চেয়ে আরিফ তিন পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভিসি ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর। এই ফোনালাপ ফাঁস হলে তদন্ত টিম গঠন করেন উপাচার্য। সেই তদন্ত টিমের প্রধান ছিলেন বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. সরওয়ার মুর্শেদ রতন। পরে সাবেক প্রক্টরসহ অন্যদের চাপে তিনি পদত্যাগ করেন। এতে থেমে গেছে তদন্ত কাজ। পরে আরিফ হাসান খান বিচার চেয়ে তিন পৃষ্ঠার একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন উপাচার্য বরাবর।

এসব অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী বলেন, ‘আমার সময়ে শিক্ষক নিয়োগে যত ফোনালাপের অডিও ফাঁস হয়েছে তার জন্য তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তদন্ত টিমের সুপারিশ অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে এমন নজির রয়েছে। তবে আরিফের বিষয়টি জানার পর তদন্ত টিম করেছিলাম। সেই কমিটির প্রধান পদত্যাগ করলে আরেকজনকে প্রধান করা হয়েছে। সেটির তদন্ত চলছে। তদন্তে কোনো পক্ষপাতিত্ব ও চাপ সৃষ্টির বিষয়টি ঠিক নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে। তবে কাজেও হরিলুট কারবার চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বড় দুটি টেন্ডার ঘিরে ইবির প্রধান প্রকৌশলীকে হুমকি দেন সাবেক প্রক্টর মাহবুবর রহমান ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাকিব। তারা একটি বড় কাজ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতাকে দেওয়ার জন্য চাপ দেন।

কাজ না দিলে পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর প্রধান প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুল পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সব কিছু জানিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন। এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে ওই প্রকৌশলীর বাসায় গোপনে এসে দেখা করেন এবং বাড়াবাড়ি না করার জন্য চাপ দেন সাবেক প্রক্টর মাহবুবর রহমান। এ বিষয়ে উপাচার্য তদন্ত টিম গঠন করলেও শুধু তার ঘনিষ্ঠজনের জড়িত থাকায় তদন্ত থেমে আছে।

এর পাশাপাশি প্রতিটি কাজ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভিসিপন্থী কয়েকজন শিক্ষক নেতার বিরুদ্ধে। ঠিকাদারদের জিম্মি করে মেগা প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। প্রতিটি কাজ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন নিচ্ছে ইবি প্রশাসন। এর বাইরেও নানাভাবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে বর্তমান প্রক্টর পরেশ চন্দ্র বর্মণ ৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ না করেই বিল তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘প্রধান প্রকৌশলীকে হুমকি দেওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। এরপর আমি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত টিম করেছি। করোনার কারণে টিম কাজ করতে পারছে না।’