শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উৎকণ্ঠায় অভিভাবক

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উৎকণ্ঠায় অভিভাবক

তিতলি দাস, জাককানইবি ১০:২৭ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

print
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উৎকণ্ঠায় অভিভাবক

করোনা পরিস্থিতিতে শিশুদের মনে ভয় তৈরি হয়ে সৃষ্টি করছে মানসিক চাপ। শিশুরা বুঝতে পারে না করোনাভাইরাস কি, এটি কীভাবে ক্ষতি করে, কেন তাদের এখন সারাক্ষণ ঘরেই থাকতে হচ্ছে। হঠাৎ করে তাদের স্বাভাবিক রুটিনটা এলোমেলো হয়ে গেছে। স্কুল বন্ধ, শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না, খেলতে বা বেড়াতেও যেতে পারছে না। এতে তাদের আবেগ ও আচরণের মধ্যে পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অকারণে তারা জেদ করছে, কান্নাকাটি করছে। 

শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি থাকায় করোনাভাইরাসে তারা অপেক্ষাকৃত কম আক্রান্ত হলেও পরিস্থিতির নীরব শিকারে পরিণত হচ্ছে। ১৮ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। পরিস্থিতি ভালো না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে। শিশুরা গৃহবন্দি। এতে শিশুদের মনোজগতে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। আবদ্ধ অবস্থা শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। শিশুর সময় কাটানোর জন্য আরেকটা শিশুর দরকার হয় যা এখন সে পাচ্ছে না। শিশুদের তাই দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাটাতে হচ্ছে অনলাইনে গেম খেলে, টিভি দেখে অথবা সাময়িক সময়ের জন্য পড়াশোনা করে।

শহরের কিছু স্কুল অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও গ্রামের শিশুরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারি টেলিভিশনে পাঠদান অনুষ্ঠান হলেও অনেকে তা জানেনই না আবার অনেকের সুযোগ না থাকায় তারা পাঠদানে অংশগ্রহণ করতে পারছে না।

করোনায় শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে শিশুদের বিনোদন কিংবা শিক্ষামূলক সব কার্যক্রম। ঘরবন্দি মানুষের সঙ্গে নাভিশ্বাস তাই শিশুদেরও। এমন অবস্থায় তারা মানসিকভাবে হয়ে পড়ছে বিপর্যস্ত।

তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন অনেকটাই ঝুঁকির মুখে। আর এ নিয়ে পিতামাতা ও অভিভাবকদের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। বাচ্চাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় তাই অভিভাবকদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলো, বাতাস ও মাটি থেকে বঞ্চিত বাচ্চাদের এখন দিতে হবে বিকল্প কোনো ভালো লাগার আবহ যা তাদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে সহায়ক হয়।

এ জন্য ঘরে থেকে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে সামাজিকীকরণ বজায় রাখতে হবে। অভিভাবকদের উচিত হবে শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করা কিংবা অন্যান্য কাজে তাদের ব্যস্ত রাখা। দূরের আত্মীয়স্বজনকে সঙ্গে ফোনালাপ কিংবা ভিডিও-আলাপ বাড়াতে হবে। ঘরবন্দি থাকাকালে যেহেতু বাচ্চারা বাইরের খাবার দাবার খেতে পারছে না, তাই বাসায় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর এবং মজাদার খাবার তৈরি করে তাদের খাবারের চাহিদা পূরণ করতে সচেষ্ট থাকতে হবে। দিনের পুরোটা সময় বাসায় কাটানোর ফলে বাচ্চাদের মধ্যে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্রতি সার্বক্ষণিক নির্ভরতা তৈরি হয় যা বাচ্চার মানসিক স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক সম্পর্ক দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এই নির্ভরতা কমানোর জন্য বাচ্চাদের অংকন কিংবা হাতের কাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গান, আড্ডা ও মজা বাচ্চাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিমুক্ত এবং তরতাজা রাখতে সহায়তা করবে। সেইসঙ্গে শিশুদের নিয়মিত পড়াশোনাও করাতে হবে যেন তাদের বই পড়ার অভ্যাস বজায় থাকে। শিশুদের নিয়ে শিক্ষামূলক ভিডিও, মুভি কিংবা ডকুমেন্টারি দেখা যেতে পারে। সর্বোপরি, শিশুরা যেন একা হয়ে না যায় সেদিকটা অভিভাবকের মনে রাখতে হবে। বাড়িতে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যমেই তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমতে পারে বলে আমি মনে করি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মাসুমা পারভীন বলেন, বর্তমান সময়ে আমরা অনেকটা গৃহবন্দি। এর ফলে আমরা মানসিকভাবে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছি। করোনা বড়দের তুলনায় শিশুদের ওপর বেশি পরিমাণে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকা এবং বাইরে বের হতে না পারার কারণে তাদের মানসিক বিকাশ সঠিকভাবে হচ্ছে না। বেশিরভাগ পিতা-মাতাই বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত।

দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি থাকার কারণে শিশুদের আচরণে বিভিন্ন রকম পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন এই লকডাউনের সময় বাসায় থাকতে থাকতে শিশুরা অনেক বেশি এগ্রেসিভ আচরণ করছে। বাবা-মার কথা শুনতে চাচ্ছে না। জেদ বেড়ে গেছে, কোনো কাজই হয়তো ঠিকমতো করছে না। আবার অনেকেই অনেক বেশি চুপচাপ হয়ে পড়েছে, ঠিকমতো কথা বলছে না, কারও সঙ্গে মিশতে চাইছে না, মন মরা হয়ে থাকছে অথবা একাকী থাকতে পছন্দ করছে। দীর্ঘ সময়ব্যাপী শিশুর এই ধরনের আচরণ তার মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতির অন্যতম কারণ। এই ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে বাবা-মাকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিশুর ওপর অহেতুক রাগারাগি করা যাবে না। শিশু যে মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে সময়টাকে অতিবাহিত করছে বাবা মা কে তা বুঝতে হবে। মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে। এ সময় বাবামারা তাদের সঙ্গে নিয়ে নতুন রুটিন তৈরি করতে পারেন। শিশুদের বাসার ছোট ছোট কাজে যুক্ত করতে পারেন। এক কথায় শিশুকে তার পছন্দের কাজে যুক্ত করার পাশাপাশি বাবা-মার উচিত একটু বাড়তি যত্ন নেওয়া। তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতেও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব।

করোনার সময়ে আমরা আরও দেখতে পাচ্ছি নারীদের পাশাপাশি শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংস্পর্শে চলে আসছে। ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দীর্ঘ অবসর শিশুদের মনে দীর্ঘমেয়াদি একটা ট্রমা তৈরি করে চলেছে। সন্তানদের শিক্ষাদান এবং তাদের ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখার চেষ্টা এবং নিজেদের কাজ ঠিক রাখা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চাপ প্রতিনিয়ত অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে চলেছে।