ঢাবির হলে করোনা ঝুঁকি

ঢাকা, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২০ | ২৪ চৈত্র ১৪২৬

ঢাবির হলে করোনা ঝুঁকি

সিনজাত রহমান সানি, ঢাবি ১০:২১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৫, ২০২০

print
ঢাবির হলে করোনা ঝুঁকি

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ২১৩-ক নম্বর রুমে চারজনের বিছানার জায়গায় গাদাগাদি করে থাকেন ৩৫-৪০ শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষের বা সদ্য দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছেন। এমন গণরুমে ঘুমের মধ্যে চাইলেই কেউ এপাশ-ওপাশ হতে পারেন না।

অপরিচ্ছন্নভাবে এক রুমে এত মানুষ থাকায় খুব সহজেই করোনা ভাইরাস বা যে কোনো রোগ সংক্রমণ ঘটতে পারে। হলের গণরুম ছাড়াও টিভি রুম ও মসজিদ কক্ষে এভাবে ঘুমাতে হয় শিক্ষার্থীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি আবাসিক হলের চিত্র এমনই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলের গণরুমে চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এভাবেই আছেন। ছেলেদের ১২টি হলে সরেজমিনে পরিদর্শন করে গণরুমগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দৃশ্যমান হয়। বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর দাবি, করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমণ রোধে কর্তৃপক্ষের উচিত সব একাডেমিক কার্যক্রম এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনই একাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত করার কথা ভাবছে না।
শিক্ষার্থীরা জানান, প্রত্যেক বিভাগে ক্লাসে শিক্ষার্থী থাকে ৭০ বা ৮০ জন। অন্যদিকে আবাসিক হলগুলোতে ক্যান্টিনে একসঙ্গে ৮০-১০০ শিক্ষার্থী খেতে বসেন। গণরুমের বাইরে সাধারণ রুমগুলোতেও থাকেন ৮-১০ জন। শিক্ষার্থীরা বলছেন করোনা ভাইরাস সংক্রমণের উচ্চ আশঙ্কার সময়ে এই চলাফেরা ও গাদাগাদি করে থাকাটা অত্যন্ত উদ্বেগের। বেশিরভাগ হল কর্তৃপক্ষ করোনা সম্পর্কিত সাবধানতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়া কোনো কাজ করেনি।

করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় গতকাল রোববার বেলা ২টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ২৫টি বিভাগের শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছেন। বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য অর্থনীতি, আইন, প্রাণিবিদ্যা, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, মার্কেটিং, অ্যাকাউনটিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম, টেলিভিশন এন্ড ফিল্ম স্টাডিজ, জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ, শিক্ষা ও গবেষণা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ফলিত রসায়ন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, সমুদ্র বিজ্ঞান, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, অপরাধ বিজ্ঞান, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, দর্শন, ফার্মেসি, পদার্থ বিজ্ঞান। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বেশ কিছু বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধের জন্য নিজেদের মধ্যে ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ক্লাসে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা বলেন, এমন সংকটময় মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চুপ থাকলেও আমরা থাকতে পারি না। যার কারণে প্রত্যেক বিভাগের সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সম্মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এদিকে ক্যাম্পাস বন্ধের দাবিতে রোববার (১৫ মার্চ) বেলা ২টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অনশন অব্যাহত রেখেছেন বিশ^বিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থী। গত শনিবার (১৪ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যে অনশন শুরু করেন তারা। অনশনে যাওয়া শিক্ষার্থীরা হলেন টেলিভিশন এন্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মো. হাসান বিশ্বাস, মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জোনাইদ হোসেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত প্লাবন ও কে এম তূর্য।

এ বিষয়ে হাসান বিশ্বাস বলেন, সাড়া বিশ্বে করোনা মহামারী আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জনবহুল এলাকা। এখানে একবার করোনা সংক্রমণ হলে ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে। তাই আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ দেওয়া হোক।

রোববার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন ও উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীরা। গতকাল ডাকসুর পক্ষ থেকেও বিশ^বিদ্যালয় বন্ধের জন্য কর্তৃপক্ষ বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রভোস্ট কমিটির এক সভায় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী এবং অন্যদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়। কোন শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কোন সদস্য বিদেশ থেকে আসার পর তিনি যেন সেলফ কোয়ারেন্টাইনে থাকেন সেই অনুরোধও করা হয়েছে।

ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত না হয়ে কোনো জরুরি প্রয়োজনে হল প্রভোস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন এবং সবাইকে সতর্ক ও পরিষ্কার-পরিছন্ন থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন।

একাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত করার বিষয়ে বিবেচনা করছেন কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে প্রক্টর অধ্যাপক একেএম গোলাম রাব্বানী বলেন, তারা (বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন) আলোচনা করে জানাবেন। অধ্যাপক রাব্বানী বলেন, যদি কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে আমরা যেকোনো ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছি।

এদিকে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সব বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছেন।