যাচ্ছেতাই হচ্ছে জাবিতে

ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ২ আশ্বিন ১৪২৬

যাচ্ছেতাই হচ্ছে জাবিতে

সনজিৎ সরকার উজ্জ্বল ১০:৪৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৯

print
যাচ্ছেতাই হচ্ছে জাবিতে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) সংকট বেড়েই চলেছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) উন্নয়ন প্রকল্প পাস হওয়ার পর থেকেই গাছ কেটে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ তোলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। বিচ্ছিন্নভাবে এ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করা হচ্ছিল। গত মাসের শেষদিকে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, উন্নয়ন প্রকল্পে যাতে বিরোধিতা না করতে পারে সেজন্য ছাত্রলীগকে দুই কোটি টাকা দিয়েছেন জাবি উপাচার্য। দুর্নীতির এ খবর প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। এ আন্দোলনে গত দুদিন ধরে স্থবিরতা নেমে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে। অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে শিক্ষা কার্যক্রমেও। উদ্ভূত পরিস্থিতি ও উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় ১৯ জন সিনেট সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে উপাচার্যপন্থি সিনেট সদস্যরা দাবি করেছেন, উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ প্রশ্নাতীতভাবে মিথ্যা। সার্বিক পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, যাচ্ছে তাই অবস্থা চলছে তাদের ক্যাম্পাসে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ তিন দফা দাবিতে বুধবারও (৪ সেপ্টেম্বর) প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এ অবরোধ কর্মসূচি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ও পুরনো দুটি প্রশাসনিক ভবন অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন তারা। অবরোধকারীদের দাবিগুলো হচ্ছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ঘিরে নির্মিতব্য তিনটি ১০তলা হলের বিকল্প স্থান নির্বাচন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতির অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্ত।

আজ অবরোধকারীরা ভবন তিনটির প্রবেশের সব ফটক বন্ধ করে দেন। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ভবনে প্রবেশ করতে না পেরে বাইরে অপেক্ষা করে ফিরে গেছেন। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এ ছাড়া ভিসি অফিসের সব কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। অবরোধকারীরা জানিয়েছেন, তাদের অবরোধ সফল হয়েছে।

আন্দোলনকারী শিক্ষক অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের দুই কোটি টাকা ছাত্রলীগের মধ্যে ভাগাভাগির যে অভিযোগ এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা মিথ্যা দাবি করছে। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কোনো উচ্চতর কমিটির মাধ্যমে এই অভিযোগের তদন্ত হতে হবে।’

এদিকে বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে সকাল সোয়া ৯টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য নুরুল আলম (শিক্ষা) ও আমির হোসেন (প্রশাসন)। দাবির বিষয়ে তারা ইতিবাচক আশ্বাস না দেওয়ায় আন্দোলনকারীরা তাদের ফিরিয়ে দেন। পরে সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ শেখ মো. মনজুরুল হক, প্রক্টর ফিরোজ উল হাসান ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা কথা বলতে এলেও দাবির বিষয়ে ইতিবাচক কিছু জানাতে না পারায় তারাও ফিরে যান। এ বিষয়ে প্রক্টর গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা তাদেরকে (আন্দোলনকারীদের) আলোচনায় বসার জন্য বলেছি, কিন্তু তারা আগেই দাবি মানার শর্ত দিয়েছে। শর্ত দিয়ে তো আলোচনায় বসা যাবে না। আমরা চাই আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান হোক।’

এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ছাড়া কেবল চা-বিস্কুট খাওয়ার জন্য তারা আলোচনায় বসতে রাজি নন। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান বলেন, স্পষ্ট দাবির বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্যও সুস্পষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু তারা আলোচনার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়ে আসেনি। কালক্ষেপণের জন্য কিংবা চা-বিস্কুট-খোশগল্পের জন্য আমরা তথাকথিত আলোচনায় যেতে রাজি নই। দাবির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট অবজারভেশন পেলে আলোচনায় বসব আমরা।

বেলা ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিক অনুষদের লাউঞ্জে সংবাদ সম্মেলন করেন উপাচার্যপন্থি সিনেটররা। এতে ভিন্ন মতাদর্শী অন্তত ১৯ জন সিনেটর উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ প্রশ্নাতীতভাবে মিথ্যা বলে যুক্তি দেন সিনেটর অধ্যাপক এ টি এম আতিকুর রহমান। এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সিনেটর অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য একত্রিত হয়েছি। আমরা সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে রয়েছি।

অন্যদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের টাকায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ জন সিনেট সদস্য। গত মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট থেকে নির্বাচিত সিনেটররা। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেন, ‘এই মেগা প্রকল্প সম্পর্কে সিন্ডিকেট ও সিনেট সভায় উপস্থাপন করা হয়নি এবং তাদের কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি। মাস্টারপ্ল্যান করার সময় যথাযথ ধাপ অনুসরণ করা হয়নি এবং অংশীজনের সঙ্গে আলোচনাও করা হয়নি।’ তারা অভিযোগ করে বলেন, ‘মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের কারও এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের যোগ্যতা নেই। উপাচার্য তার ব্যক্তিগত সচিবসহ অনুগত ও অদক্ষ ব্যক্তিদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে রেখেছেন। এ ছাড়া, উপাচার্য তার অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আর্কিটেক্ট ফার্ম নির্বাচন করেন।’

এ সময় তারা ই-টেন্ডার না করার কারণে টেন্ডার ছিনতাই হওয়ার ঘটনায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করে সমালোচনা করেন। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, ও বিচার বিভাগীয় তদন্তেরও দাবি করেন এসব সিনেটররা।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগে যেসব সিনেটর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা হলেন কায়কোবাদ হোসেন, ইবাদুল্লাহ তালুকদার, আশীষ কুমার মজুমদার, মহব্বত হোসেন খান, শামীমা সুলতানা, আনোয়ার হোসেন মৃধা, আবুল কালাম আজাদ, মনোয়ার হোসেন, শরীফ এনামুল কবির, খন্দকার মহিদ উদ্দিন, ইন্দু প্রভা দাস, সোহেল পারভেজ, কৃষ্ণা গায়েন, মেহেদী জামিল, শামছুল আলম, মোহাম্মদ কামরুল আহসান, শামীমা সুলতানা, শিহাব উদ্দিন, সাবিনা ইয়াসমিন।

আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের এ কর্মসূচি আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। অবরোধের বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করা হলেও অধিকাংশ বিভাগেই ক্লাস-পরীক্ষা হয়েছে। আর পরিকল্পনা অনুযায়ীই মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। তিনি আন্দোলনকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) থেকে পাস হওয়া ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি নতুন আবাসিক হলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। এতে মোট বরাদ্দ সাড়ে চারশ কোটি টাকা। বরাদ্দের সেই টাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে এক কোটি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে এক কোটিসহ মোট দুই কোটি টাকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে।