ঢাবি ও সাত কলেজের পাল্টা কর্মসূচি

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬

ঢাবি ও সাত কলেজের পাল্টা কর্মসূচি

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:২২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০১৯

print
ঢাবি ও সাত কলেজের পাল্টা কর্মসূচি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) অধিভুক্তির পর থেকেই ঢাকার সাত কলেজের প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী অসন্তুষ্ট। তাদের অভিযোগ, ঢাবি প্রশাসনের অবহেলায় সেশনজট, নিম্নামানের ফলসহ নানা জটিলতার মুখে পড়েছেন তারা। অন্যদিকে ওই সাত কলেজকে ‘গলার কাঁটা’ মনে করছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ক্যাম্পাস ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ায় ভুক্তভোগী হচ্ছেন তারা। পাশাপাশি ঢাবির নিজস্বতা ও মান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

এ জন্য অধিভুক্তি বাতিল চেয়ে তারা ২০১৭ সাল থেকে আন্দোলন করছেন। পাল্টা দাবিতে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন। দুই পক্ষের আন্দোলনে জেরবার ঢাবি প্রশাসন। এসব আন্দোলনে একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, ভাঙচুর, মারামারি, মামলা, সড়ক অবরোধ সবই হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা নিরসনে ঢাবি প্রশাসন বা সাত কলেজ কর্তৃপক্ষ কারোরই হেলদোল নেই। মাঝখান দিয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন দুই লাখ সাধারণ শিক্ষার্থী। তারা দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। রোববার এসব কলেজের অধিভুক্তি বাতিল দাবিতে ঢাবির একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলোয় তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালানোর ঘোষণাও দেন তারা। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

এদিন সকাল ৯টার দিকে ঢাবির সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ তার কার্যালয়ে ঢোকার চেষ্টা করলেও শিক্ষার্থীদের বাধায় ঢুকতে পারেননি। এরপর তিনি বলেন, ‘ঢাবি শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক। এ জন্য সাত কলেজের কার্যক্রম আলাদাভাবে পরিচালিত হবে।’ এ সময় তিনি আন্দোলন প্রত্যাহারেরও আহবান জানান।

এর আগে, গত শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নীলক্ষেতে সড়কে অবস্থান নেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ঢাবির অবহেলায় তিন বিষয়ে ফেল করেছেন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী মনিজা আক্তার মিতু। এ হতাশায় গত ১৬ জুলাই মিতু আত্মহত্যা করেন এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবিতে সাত দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায় না হলে আগামী ২৭ জুলাই ফের রাজপথে নামার ঘোষণা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমাদের জীবন নিয়ে খেলছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। ফল প্রকাশে লম্বা সময় ব্যয় করা হচ্ছে, ভালো পরীক্ষা দিলেও উত্তরপত্রে প্রাপ্ত নম্বর দেওয়া হচ্ছে না, ইচ্ছামতো শিক্ষার্থীদের ফেল করানো হচ্ছে। এর দায় ঢাবিকে নিতে হবে।’

এর আগে ৮ জুলাই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথ অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করেন। সে যাত্রায় ঢাবি প্রশাসনের আশ^াসে তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।

জানা গেছে, ঢাবির সাবেক ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. হারুন-অর-রশিদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে এ সমস্যার সূত্রপাত।

এক পর্যায়ে ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সরকারের সিদ্ধান্তে এসব কলেজকে ঢাবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এসব কলেজ অধিভুক্ত করা হয়েছিল তার বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ত্রুটিযুক্ত সিলেবাস, তীব্র সেশন জটের পাশাপাশি গণহারে ফেল বেড়েছে। এ নিয়ে তারা একাধিকবার ক্লাস বর্জন, মানববন্ধন, সড়ক অবরোধসহ বহু কর্মসূচি পালন করলেও তেমন একটা ফল আসেনি। এদিকে এই অধিভুক্তিতে খুশি নন ঢাবি শিক্ষার্থীরাও। এসব কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়ার সার্বিক কাজ ঢাবির বিভিন্ন অফিসে সম্পন্ন হয়। তাদের জন্য ডিন অফিসে, ব্যাংকে লম্বা ভিড় লেগে যায়। অধিভুক্ত কলেজগুলোর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আনাগোনা ঢাবি শিক্ষার্থীদের সংক্ষুব্ধ করে তোলে।

তাদের অভিযোগ, আমাদের নিজেদেরই অনেক সমস্যা রয়েছে। তার ওপর ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ ওই সাত কলেজ। ফলে দিন দিন জটিলতা বাড়ছে। এ নিয়ে স্বস্তিতে নেই সাত কলেজ কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেউই। তবে কোন কর্তৃপক্ষই এর সুষ্ঠু সমাধান আজ পর্যন্ত দিতে পারেনি। এরপর থেকে উভয় পক্ষই দফায় দফায় নিজ নিজ দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। ২০১৭ সালের ২০ জুলাই কলেজ শিক্ষার্থীদের সমাবেশে পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেলে দৃষ্টিশক্তি হারান তিতুমীর কলেজ ছাত্র সিদ্দিকুর রহমান। এ ঘটনায় এক হাজার ২০০ ছাত্রের বিরুদ্ধে মামলাও করে পুলিশ। তারপরও চলছে আন্দোলন-পাল্টা আন্দোলন। ফলে দুই ভিসির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কপাল পুড়ছে দুই লাখ শিক্ষার্থীর।

জানা গেছে, ঢাবি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, সাত কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি ছিল না। কার্যত তারা কোন সমস্যারই সমাধান করতে পারেনি। প্রত্যেকবারই আন্দোলনের মুখে পড়ে সমস্যা নিরসনের আশ্বাস দেয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। এদিকে সাত কলেজ কর্তৃপক্ষেরও কোন উদ্যোগ নেই। দুই লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এসব অধ্যক্ষদের কোন হেলদোল নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও এ সমস্যা থেকে গা বাঁচিয়ে চলে। ফলে দুই লাখ শিক্ষার্থী সিদ্ধান্তহীনতার ফল ভোগ করছেন।

শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না করা গেলে জটিলতায় বাড়বে। এজন্য উভয় কর্তৃপক্ষ বসে একটা বাস্তব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, সাত কলেজের দাবি পূরণ করা হচ্ছে। আর ঢাবি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির আন্দোলনে প্রশাসনও একমত। অধিভুক্ত কলেজের কার্যক্রম নিজ নিজ ক্যাম্পাসেই পরিচালিত হবে। তারা ঢাবির পরিচয়পত্র পাবে না। ঢাবির আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, পাঠাগারসহ কোন সেবাই তারা ব্যবহার করতে পারবে না।

অধিভুক্ত সাত কলেজ হলো- ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ।