এবারও কি ব্যর্থ হবে ওরা?

ঢাকা, বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

এবারও কি ব্যর্থ হবে ওরা?

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ০৯, ২০১৯

print
এবারও কি ব্যর্থ হবে ওরা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকে নানা দুর্দশার মধ্যে কাটছে রাজধানীর সাত কলেজের আড়াই লাখ শিক্ষার্থীর জীবন। যেসব আশঙ্কায় দুই বছর আগে শিক্ষার্থীরা ঢাবির অধিভুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছিল, সেসব আশঙ্কার সব কটিই সত্যি হয়েছে। বেড়েছে সেশন জট। একাডেমিক রুটিনে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। পরীক্ষা ও পরীক্ষার ফল প্রকাশে সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা। পরীক্ষা দিয়ে ফলের জন্য শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে ছয় থেকে সাত মাস। অব্যবস্থাপনার কারণে এক বিষয়ে ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হতে হচ্ছে সব বিষয়ে। অধিভুক্ত সাত কলেজে এখনো পাঠদান চলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে। অথচ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র করা হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিয়মে। ফলে প্রস্তুতি থাকলেও পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা।

অথচ শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা ও অভিযোগকে আমলে না নিয়ে প্রথম থেকেই তাদের আন্দোলনে লাঠি, টিয়ার, গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। রাস্তায় বেদম পেটানো হয় শিক্ষার্থীদের। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শাহবাগে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে চোখ হারিয়েছিল তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান। সিদ্দিকের চোখের বিনিময়েও শিক্ষার্থীরা কোনো আশার আলো দেখতে পায়নি গত দুই বছরে। কিছু দিন পর পরই তাদের নামতে হচ্ছে রাস্তায়। নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ধরনা দিচ্ছে। বারবার আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিশ্বাসভঙ্গ করছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। সরকারও পালন করছে নীরব ভূমিকা।

উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সাতটি সরকারি কলেজ ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত করা হয়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার মান তো দূরের কথা, নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমই পরিচালনা করতে পারছে না ঢাবি।

পর্যাপ্ত লোকবল, পরিকল্পনা এবং আন্তরিকতার অভাবে সাত কলেজের দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে ঢাবি প্রশাসন। গত দুই বছরে ঢাবি সাত কলেজের জন্য স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ক্যালেন্ডার তৈরি, সেশন জটিলতা নিরসনের কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। উপরন্তু এক বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একাধিক বিষয়ে ফেল করার ঘটনা ঘটছে নতুন অধিভুক্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। পরীক্ষা দেওয়ার পরও অনুপস্থিত দেখানো, সঠিকভাবে নম্বর না দেওয়ায় গণফেলের মতো ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অব্যবস্থাপনার ফলেই ঘটছে এমন ঘটনা। এসব অব্যবস্থাপনা ও ভোগান্তির সুরাহা চেয়ে গত এপ্রিলে ৫ দফা দাবিতে আবার আন্দোলনে নামে সাত কলেজেরে শিক্ষার্থীরা।

তাদের দাবি ছিল, পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ত্রুটিমুক্ত ফল প্রকাশসহ ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ২০১৬ সালের অনার্স চতুর্থ বর্ষ এবং ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ২০১৭ সালের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের লিখিত পরীক্ষাসহ সব বিভাগের ফল একত্রে প্রকাশ করা; ডিগ্রি, অনার্স, মাস্টার্স সব বর্ষের ফল গণহারে অকৃতকার্য হওয়ার কারণ প্রকাশসহ খাতার পুনর্মূল্যায়ন করা; সাত কলেজ পরিচালনার জন্য স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ভবন; প্রতিমাসে প্রত্যেকটা বিভাগে প্রতি কলেজে দুদিন করে মোট ১৪ দিন ঢাবির শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়া; সেশনজট নিরসনের লক্ষ্যে একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রকাশসহ ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করা। ওই সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বিশেষ পরীক্ষা নিয়ে ফল জটিলতার দ্রুত সমাধান ও সাত দিনের মধ্যে একাডেমিক ক্যালেন্ডার তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন। আশ্বস্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করে। কিন্তু দুই মাসের বেশি সময় পার হলেও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ৫ দফা দাবিতে গত শনিবার (৬ জুলাই) থেকে ফের আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের মধ্যেই গতকাল সোমবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করে ফের দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন উপাচার্য।
উপাচার্যের আশ্বাসে এবারও আন্দোলন কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এবারও কি ব্যর্থ হবে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা? এবারও কি বিশ্বাসভঙ্গ করবেন উপাচার্য?

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সাত কলেজের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। তার আগে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ১০টায় ঢাকা কলেজের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নীলক্ষেতে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণের সামনে গিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে তাদের প্রতিনিধিদল উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেয়। এ সময় উপাচার্য তাদের আশ্বস্ত করেন, ৯০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশসহ সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এটি কার্যকর হতে ছয় মাস লাগবে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, যেসব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন, তারা নিজ কলেজে এ বিষয়ে আবেদন করতে পারবেন।

সে সঙ্গে উপাচার্য জানিয়েছেন, সাত কলেজের জন্য স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। সাত কলেজের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কলেজগুলোর শিক্ষকরাই প্রণয়ন করবেন, তাদের একাডেমিক সনদেও কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। কলেজগুলোর জন্য শিগগিরই একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা হবে।

এদিকে ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের নানা ভোগান্তি, দুর্দশা ও স্বপ্নভঙ্গের কথা বলছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। তাদের অনেককে নিজেদের স্বপ্নভঙ্গের কথা লিখেছেন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমেও। কেউ কেউ হতাশায় আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা অধিভুক্ত সাত কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান নান বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরছেন বিভিন্ন মাধ্যমে।

নাজমুল হোসেন নামের কবি নজরুল কলেজের এক শিক্ষার্থী একটি চিত্রে দেখাচ্ছেন, সাত কলেজে ২০১৩-১৪ সেশনে অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষা দিয়ে ফলের জন্য অপেক্ষা করছেন ৫ মাস ধরে তখন একই সেশনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাস্টার্সের ফরম পূরণ করছেন এবং বিসিএস, এসআই ও শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন। একই সেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স শেষ হয়েছে অন্তত চার মাস আগে। তারাও বিসিএস, এসআই ও শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় সুযোগ পাচ্ছেন।

২০১৫-১৬ সেশনের সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা যখন মাস্টার্স পরীক্ষা দিচ্ছেন, তারও দুই বছর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন।

সাত কলেজে ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থী, যাদের মাস্টার্সের ক্লাস চলমান, তখন একই সেশনের জাতীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শেষ হয়েছে অন্তত এক বছর আগে।

অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ভিসির দ্বন্দ্বের বলি হতে হয়েছে আমাদের। আমাদের কী দোষ? আমরা কি চেয়েছিলাম আমাদের অধিভুক্ত করা হোক? এখন কেন এজন্য আমাদের ভুক্তভোগী হতে হবে? এই দায় সম্পূর্ণভাবে দুই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিতে হবে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, এসব কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বর্তমানে ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৩৬ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এর আগে ঢাবির অধিভুক্ত কলেজ ছিল ১০৪টি। নতুন সাতটি যোগ হওয়ায় এ সংখ্যা এখন ১১১টি। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ১০৪টি কলেজ ও ইনস্টিটিউটের শিার্থী সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৬৯৮ জন, শিক্ষক সাত হাজার ৫৯১ জন। ফলে নিজস্ব ৩১ হাজার ৯৫৫ জন শিক্ষার্থীর বাইরে আরো দুই লাখ আট হাজার শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যাপ্ত জনবল ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে নিজস্ব শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া ও ফল তৈরিতে বিলম্বের কারণে বেশ কয়েকটি বিভাগে সেশনজট চলছিল। এর মধ্যেই ২০১৭ সাল থেকে অধিভুক্ত সাত কলেজের বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে হয়েছে ঢাবিকে।