আশার ডাকসুতে নিরাশা

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

আশার ডাকসুতে নিরাশা

হাসান ওয়ালী ১০:৪০ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০১৯

print
আশার ডাকসুতে নিরাশা

২৯ বছর পর সচল হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল সে আশা-নিরাশার চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অধিকারভিত্তিক কর্মসূচি, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং সাংস্কৃতিক আবহ আরও সুসংহত করার ব্যাপারে ডাকসুর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি এখনো। নির্বাচনের দুই মাসেও সমন্বয় গড়ে ওঠেনি ডাকসুর ভিপি-জিএসের মধ্যে। ফলে ডাকসু নিয়ে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ডাকসু নেতারা শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার পক্ষে কাজ করার চেয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার এবং আখের গোছাতেই ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভিপি-জিএসের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। ইতোমধ্যে তাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হয়েছে। এতে কার্যত থমকে আছে ডাকসুর কার্যক্রম। প্রায় ২৯ বছর পর গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় ডাকসু নির্বাচন।

নির্বাচনে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, কোটা আন্দোলনকারী, বাম জোটসহ অংশ নেয় মোট ১২ প্যানেল। ভোট কারচুপির অভিযোগের মধ্যে শুরু হওয়া নির্বাচন শেষ হয় ছাত্রলীগ ব্যতীত অন্য সংগঠনগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে। বর্জনের মধ্যেই ভিপি নির্বাচিত হন কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নুরুল হক নুর। ডাকসুর ১৫ সদস্যের মধ্যে নুরের প্যানেলের আখতার হোসেন সমাজসেবা সম্পাদক নির্বাচিত হলেও বাকি পদগুলো যায় ছাত্রলীগের দখলে। বিজয়ী হয়ে নানা নাটকীয়তা শেষে দায়িত্ব নেন নুর। যদিও এরই মধ্যে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার অভিযোগ করেছেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ডাকসু নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের দেওয়া ইশতেহারে ছিল আশ্বাসের ফুলঝুরি। আবাসন সংকট দূর, খাবারের মান বাড়ানো, গেস্টরুম প্রথা বাতিলসহ শিক্ষার্থীদের পক্ষে নানা আশ্বাস ছিল প্রার্থীদের। কিন্তু ডাকসু-পরবর্তী প্রায় দুই মাস পেরুতে চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি ডাকসুকে। এর পরিবর্তে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে নজর দিয়েছেন ভিপি-জিএস। বিভিন্ন হলে ভিপি নুরুল হক নুর এবং জিএস গোলাম রাব্বানী যাচ্ছেন ঝটিকা পরিদর্শনে। নিজেদের কর্মী-সমর্থক মারফত সে ছবি ছড়িয়ে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

এদিকে চরম সমন্বয়হীনতা চলছে ‘সেকেন্ড পার্লামেন্ট’ খ্যাত ডাকসুতে। ইতোমধ্যেই ডাকসুর কয়েক রকমের অফিশিয়াল প্যাডের দেখা মিলেছে। যাতে বিভিন্ন সময় ভিপি, জিএসের আলাদা আলাদা বিবৃতির দেখা মিলেছে। এসব বিবৃতি ডাকসুর ভিপি-জিএস এবং কমিটির অন্যান্য সদস্যের মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে প্রকাশ্য করেছে।

পহেলা বৈশাখকে বরণ করতে গত ১৩ ও ১৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখবরণে কনসার্টের আয়োজন করে ছাত্রলীগ। এ আয়োজনকে ডাকসু এবং ছাত্রলীগের যৌথ আয়োজন বলে দাবি করেন ডাকসু জিএস এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। কিন্তু এ নিয়ে ডাকসুর মিটিংয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন ভিপি নুরুল হক নুর। যদিও শেষ পর্যন্ত কোমল পানীয়র ব্র্যান্ড মোজোর সহযোগিতায় আয়োজন করা এ আয়োজন ভেস্তে দেয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের অনুসারীরা। সর্বশেষ টিএসসিভিত্তিক সংগঠনগুলোর অনুষ্ঠান করতে ডাকসুর অনুমতি লাগবে বলে একক সিদ্ধান্ত জানান জিএস গোলাম রাব্বানী। এ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ডাকসুতে নির্বাচিতরা তাদের প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করছেন। তারা ইশতেহার ভুলে গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে উজ্জ্বল করতেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে খোলা কগজকে বলেন, ডাকসু তো শুধু ‘তথাকথিত ছাত্রনেতা’ তৈরির কারখানা হতে পারে না। এখন আমরা দেখছি, ডাকসু নেতারা এ পরিচয়কে পুঁজি করে ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে অবস্থান শক্ত করতে কাজ করছেন। নির্বাচনের আগে ডাকসু নিয়ে আমাদের মনে যে উচ্চাশা ছিল, তা ইতোমধ্যেই হতাশায় পরিণত হয়েছে। এখন দেখার বিষয় বাকি সময়টুকু তারা কী করেন।

দুই মাসের মতো সময় পেয়েও ইশতেহারে প্রদেয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর কর্মসূচি কেন দিতে পারেনি-এমন প্রশ্নের জবাবে ডাকসু নেতারা পরস্পরকে দুষেছেন। ডাকসুর সমন্বয়হীনতা নিয়ে কথা হয় ডাকসুর এজিএস এবং ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের সঙ্গে। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, বৈশাখবরণে কনসার্টের আয়োজক ডাকসু ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উদ্যোগে আমরা আয়োজন করেছিলাম। আর ভিপি ডাকসুর চেয়ে তার সংগঠনের কাজে বেশি মনোযোগী। আমরা ডাকসুর কার্যক্রম নেওয়ার ক্ষেত্রে তার অসহযোগিতার শিকার হচ্ছি। আমরা অনুরোধ করব ভিপি হিসেবে তার ভূমিকা রাখতে।

ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বলছেন ভিন্ন কথা। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই তিনি অসহযোগিতামূলক আচরণ পাচ্ছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ ডাকসুকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও আমি অসহযোগিতার মুখে পড়েছি। তারা যেহেতু একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতা, তারা প্রথমত তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। এর পরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা ভাবে। কিন্তু আমাদের কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্যই কথা বলি।

ডাকসু জিএস এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ভিপি ডাকসুর চেয়ে তার সংগঠন স্টাবলিশ করা এবং নিজের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার গোছানো নিয়ে বেশি ব্যস্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে নিয়ে রাজনীতি করছেন।