গবেষণায় বরাদ্দ ‘অপ্রতুল’, ব্যাহত মানসম্মত গবেষণা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২ | ১৫ আষাঢ় ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

গবেষণায় বরাদ্দ ‘অপ্রতুল’, ব্যাহত মানসম্মত গবেষণা

লাবু হক, রাবি
🕐 ৫:২৮ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২২

গবেষণায় বরাদ্দ ‘অপ্রতুল’, ব্যাহত মানসম্মত গবেষণা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বরাদ্দকৃত বাজেটের পরিমাণ প্রতি অর্থবছরে বাড়লেও উল্লেখ্যযোগ্য হারে বাড়েনি গবেষণা খাতে বরাদ্দ। ফলে গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানসম্মত গবেষণা কার্যক্রম দারুনভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ গবেষকদের।

গবেষকরা বলছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষিত বাজেটে গবেষণায় বরাদ্দ শতাংশের হিসেবে খুবই নগন্ন। এই বাজেট গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য ও অন্যান্য গবেষণাসামগ্রী সংগ্রহে অপ্রতুল। যা দিয়ে কখনই মানসম্মত গবেষণা কার্যাবলি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। গবেষণা খাতে নূন্যতম পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, গবেষণা কাজের জন্য উন্নতমানের ল্যাব এবং কম্পিউটার না থাকায় কম্পিটিশনাল গবেষণায় পিছিয়ে পড়ছেন তারা। আর গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির স্বল্পতা এবং পুরোনো যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্যের কারণে গবেষণায় নানা সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। ফলে গবেষণা বিমুখ হয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে রাবির বাজেটের আকার ছিল ৪৩৫ কোটি ৫২ লক্ষ টাকা। গবেষণায় ব্যয় করা হয়েছে ১২ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা। যা মোট বাজেটের ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে রাবির বাজেটের আকার ছিল ৪৩২ কোটি ৯৭ লক্ষ টাকা। গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি, যা মোট বাজেটের ১ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট বাজেট ছিল ৩৯৮ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা, গবেষণায় বরাদ্দ ছিল চার কোটি ৪০ লক্ষ, যা মোট বাজেটের ১ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট বাজেট ছিল ৩৯৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা, গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ৭৫ লক্ষ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট বাজেট ছিল ৩৯০ কোটি ৩৩ লক্ষ টাকা, গবেষণায় বরাদ্দ ছিল তিন কোটি ৫০ লক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বরাদ্দকৃত বিগত পাঁচ বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গবেষণা খাতে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ব্যয় করা হয়েছে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা। যা মোট বাজেটের ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

গবেষণায় বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে জানিয়ে স্কোপাসের জড়িপে ২০২০-২১ সেশনে রাবির বর্ষসেরা গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী শফি মাহমুদ বলেন, কিছু কিছু কেমিক্যালের দাম অনেক বেশি। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমেও কিছু কাজ করে নেওয়া যায়। কম্পিটিশনাল গবেষণা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলকভাবে কম হয়। এজন্য ল্যাবগুলোতে যদি কিছু উন্নতমানের কম্পিউটার দেওয়া হয় তাহলে কম্পিটিশনাল কাজগুলো করতে সহজ হবে। শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে উন্নতমানের ল্যাব তৈরির পাশাপাশি গবেষণায় আরও বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

গবেষণা খাতে মোট বাজেটের নূন্যতম পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এবং দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সের (টোয়াস) সদস্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে দেওয়া বরাদ্দ ‘ভয়ঙ্করভাবে অপর্যাপ্ত’। আমি মনে করি, দেশের অন্যান্য সীমাবদ্ধতাগুলোতে ছাড় দিলেও গবেষণা খাতে অন্তত ছাড় দেওয়া উচিত নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে মোট বাজেটের ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত। শুধু গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধিই নয় এর পাশাপাশি বন্টনেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্ব দেওয়া দরকার। গবেষণায় প্রণোদনা বন্টনের ক্ষেত্রে গবেষকের মেধা, যোগ্যতা এবং পূর্বের প্রকাশনা দেখা উচিত।

প্রায় একই কথা জানিয়ে বিশিষ্ট মৎস গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশরীজ বিভাগের অধ্যাপক ইয়ামিন হোসেন বলেন, গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য দেশের ন্যায় রাবিতে গবেষণা অনুদান বন্টন পদ্ধতিটি প্রতিযোগীতামূলক করা উচিত।

গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থ সংকটে শিক্ষকদের মানসম্মত গবেষণা কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ব্যবসায় প্রশসান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক হাছানাত আলী। তিনি বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষিত বাজেটে গবেষণায় বরাদ্দ শতাংশের হিসেবে খুবই নগন্ন। যা দিয়ে কখনই মানসম্মত গবেষণা কার্যাবলি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। বাজেটের অধিকাংশ ব্যয় করা হচ্ছে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে। আর অন্যদিকে গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থ সংকটে শিক্ষকদের মানসম্মত গবেষণা কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অধ্যাপক হাছানাত আলী বলেন, ‘একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে নিত্যনতুন আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের উপর। সেই উদ্ভাবন নির্ভর করে গঠণমূলক এবং বাস্তবধর্মী গবেষণায়। যেখানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করে টিকা আবিষ্কার করে, সেখানে গবেষণা খাতে অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে আমরা কোনোভাবেই ভালোকিছু করতে পারছিনা। যেটা আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকেই পিছিয়ে দিচ্ছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাবির বাজেটের আকার গিয়ে দাড়িয়েছে ৪৫৬ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকায়। তবে এবারের বাজেট গবেষণার জন্য কত শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা যায়নি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক এম হুমায়ুন কবীর বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য আমরা বাজেটের আকার প্রস্তুত করেছি। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ফাইন্যান্স কমিটির এবং সিন্ডিকেট সভায় বাজেটটি উপস্থাপন করা হবে। বাজেটটি গ্রহণযোগ্য হলে সেটির সম্পূর্ণ আকার প্রকাশ করা হবে।

বিগত অর্থবছরে গবেষণায় ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে আমরা গবেষণা খাতে নিয়মিত ব্যয় করেছি মোট বাজেটের ১২ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা এবং বিশেষ ব্যয় করেছি ইউজিসি থেকে নিয়ে আসা গবেষণা অনুদানের ১ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা।

সামনের অর্থবছরে গবেষণায় বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, আমার মূল লক্ষ্যই হলো গবেষণা। আমরা গবেষণাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতোপূর্বে আমি গবেষণার জন্য অতিরিক্ত ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ এনেছি। এবারও গবেষণা খাতে আমরা বরাদ্দ বৃদ্ধি করব। ইতোমধ্যে আমরা প্রায় ৮২ কোটি টাকার গবেষণা প্রকল্প তৈরি করেছি। এটার বরাদ্দ যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নাও দেওয়া হয় তাহলে আমি একনেকে যাবো।

গবেষণায় বরাদ্দ বন্টণের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, আমরা গবেষকদের গবেষণার মান, কিউএস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা এবং গবেষণায় অ্যাওয়ার্ড দেখে প্রণোদনা দিব। সত্যিকার অর্থেই যারা গবেষক আমরা তাদেরকেই প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করব।

 
Electronic Paper