ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ কাম্য নয়

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ কাম্য নয়

সম্পাদকীয় ১২:০৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৮, ২০২১

print
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ কাম্য নয়

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ হবে- আইনটি প্রণয়নের শুরু থেকে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। তখন সংশ্লিষ্টদের আপত্তি আমলে নেয়নি সরকার। পরে ঠিকই এর অপপ্রয়োগ লক্ষ্য করা গেছে। এ বিষয়ে গত শনিবারে বিবৃতি দেয় সম্পাদক পরিষদ। বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের আশঙ্কার চেয়েও আরও কঠিনভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগে সংবাদকর্মী ও মুক্তমত প্রকাশকারী ব্যক্তিরা ক্রমাগতভাবে নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমন আশঙ্কা আমরা আইনটি তৈরির সময়ই করেছিলাম। এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না, একজন মুক্তমনা লেখক মুশতাক আহমেদকে জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করে যেতে হলো। 

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ১০ মাস কারাবন্দি থাকার পর কার্টুনিস্ট আহমেদ কবীর কিশোরকে জামিন দেওয়ায় আদালতকে ধন্যবাদ জানাই। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সংবাদকর্মী ও লেখকদের গ্রেফতার করে তাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে নির্দয় আচরণ করছে, তা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি লেখা শেয়ার দেওয়ার কারণে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে দীর্ঘদিন নিখোঁজ ও কারাগারে থাকতে হয়েছে। পরে জামিন পেলেও তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো চলমান রয়েছে। আর্থিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কাজলকে মামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া কিশোর জামিন পেলেও তার মামলাটি চলমান আছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি মিডিয়া ওয়াচডগ বডি আর্টিকেল ১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৯৮টি মামলায় ৪৫৭ জনকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে ও গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ৪৫৭ জনের মধ্যে ৭৫ জন সাংবাদিক। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া তৈরি, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, সংসদে বিল উত্থাপন ও রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে ও পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সম্পাদক পরিষদ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু আমাদের দাবিগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আপত্তিকর ধারাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা সেগুলো সংশোধনের সুপারিশ করেছিলেন। সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হলে আজকের এ পরিস্থিতি হয়তো উদ্ভব হতো না।

এ আইনের অপরাধ ও শাস্তি সংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন অযোগ্য, ৫টি জামিনযোগ্য এবং একটি সমঝোতাসাপেক্ষ। এর ফলে অনিবার্যভাবে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুশীলন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৌশলে আইনটি যেন গণমাধ্যম ও মুক্তমনের লেখকদের ওপর প্রয়োগ করা না হয়, নিশ্চিত করতে আইনটির সংশোধন করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সংবাদকর্মীদের নামে যতগুলো মামলা হয়েছে, যতজন সংবাদকর্মী ও মুক্তমনা লেখক গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন তাদের সবার মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারে সরকারের সুবিবেচনা প্রত্যাশা করেছে সম্পাদক পরিষদ। প্রশ্নবিদ্ধ আইনটির অপপ্রয়োগ কাম্য নয়। বাস্তবতা অনুধাবন করে সরকার সম্পাদক পরিষদের দাবি আমলে নেবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।