ধর্ষণে দায়ী বিকৃত মানসিকতা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ধর্ষণে দায়ী বিকৃত মানসিকতা

ইলা লিপি ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০

print
ধর্ষণে দায়ী বিকৃত মানসিকতা

ফেসবুক দুনিয়ার সব মানুষের নিকট পৃথিবী অত্যন্ত সহজ জায়গা। এখানে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে যেমন তোলপাড় হয় ঠিক বড় বড় কোনো ঘটনা তুচ্ছ বিষয়ের নিকট চাপা পড়ে। আমি পত্রিকা পড়ি না, কোনো আড্ডায় এবং জনসমাগমে যাই না। কিন্তু ফেসবুকের কল্যাণে সব খবরাখবর জানতে পারি।

নারী নির্যাতন বৈশি^ক সমস্যা। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রে কম-বেশি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এগুলোও নেটিজেনদের কল্যাণে জানতে পারি। ডমেস্টিক ভায়োলেন্স এটা জন্ম থেকেই শুরু হয়। উন্নতির চরম পর্যায়েও মানুষ কন্যাসন্তানকে মেনে নিতে পারছে না। এই না মানতে পারার সংখ্যা ৯০ শতাংশ। মা এবং বাবা উভয়ই পুত্রসন্তান কামনা করে। যখন একের অধিক পুত্রসন্তান জন্মায় তখন শখের বিষয়ে একটা মেয়ে কামনা করে। মানুষের এ দ্বিচারিতা যুগে যুগে চলে আসছে। তাই একটি মেয়ে শিশুকে শুরু থেকেই কাপড়ের অন্তরালে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। নারীর স্তন প্রকৃতিগত। যখন এটার বৃদ্ধি ঘটে তখন শতরঞ্জি পোশাকে আবৃত করা হয়। অথচ সিম্পল বিষয়। এই স্তন কিন্তু সন্তান জন্মানোর পরে শিশু খাদ্যর জন্যই ব্যবহৃত হয়। তবুও ধর্ষণের জন্য পোশাককে দায়ী করা হয়।

আমাদের সমাজব্যবস্থা এখনো উন্নত হয়নি। সেই হাজার বছরের থিওরিতে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে যে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে, তারই প্রভাবে আজকের বাংলাদেশের কিঞ্চিৎ পরিবর্তন। আশার আলো নেই সমাজে। সমাজ পরিবর্তন ঘটছে না। এর সম্ভাবনাও নেই! কারণ সমাজে বসবাসকারী নেতৃস্থানীয় লোকরা কেবল নিজেদের প্রয়োজনে বদল ঘটাচ্ছে। নবম-দশম শ্রেণিতে একটা সাবজেক্ট আছে, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান নামে। ওই সাবজেক্টটা পড়ার সুযোগ হয়নি আমার। আমি ওটার বদলে অর্থনীতি সাবজেক্ট নিয়েছিলাম।

এ জন্য পুরুষদের থেকে আত্মরক্ষা কৌশল শেখা হয়নি। তবে এই বয়সে কোনো ছেলেদের দ্বারা কোনো প্রকার হেনস্তার শিকার হইনি মোটেই। স্কুলের শিক্ষক কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি। শিক্ষকদের সেই, অঙ্ক না শেখার পেটানো এখনো ভুলতে পারি না। সহপাঠীদের সাহায্য ছিল অতুলনীয়। ওরাই বলত, আমি ওদের বন্ধু। সময়টা ২০০৫-৬ সাল। তখনও হাতে হাতে মোবাইল পৌঁছায়নি। এরপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। তখন পরীক্ষায় পাসের হার কম ছিল। খুব কমই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আউট হতো। সবাই পড়াশোনা করত। হালের সময় যেমন শিক্ষাখাত এবং স্বাস্থ্যখাত নামেমাত্র কাগজ-কলমে আছে। বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিদিন ব্যাঙের ছাতার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ছাত্র-ছাত্রীর অভাব নেই। পরিবারও দু’হাতে টাকা খরচ করছে সন্তানদের পেছনে; অথচ আশানুরূপ সাফল্য আসছে না। গলদ আসলে কোথায়? গলদটা আমাদের মননে।

আমরা সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ঠিক করে ফেলি, সে ডাক্তার নাকি ইঞ্জিনিয়ার হবে। বাচ্চাকে প্রস্তুত করতে থাকি ভবিষ্যতের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য। আমরা একবারও খেয়াল করি না, বাচ্চাটা আসলে কী চায়। ক্লাসে প্রথম হতেই হবে এই ট্রেন্ড ওদের মধ্যে ঢোকানো হয়। একসময় বাচ্চাটা মানসিক অবসাদে ভোগে। বাবা-মাকে আর আপন ভাবতে পারে না। পারিবারিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এ দায় কাদের? আমি বলব, অতিলোভী পিতা-মাতাদের। যারা নিজের ইচ্ছেকে সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়। আমরা যদি সন্তানের ওপর ছেড়ে দিই ও ভবিষ্যতে কোন পেশায় যেতে আগ্রহী তখন সন্তানই ঠিক করবে- আসলে কী করতে চায়। এতে ফলাফল ভালো হবে।

পারিবারিক বন্ধন যদি অটুট না থাকে তবে সে সমাজে পরিবারে বিপর্যয় আসবেই। এসব সন্তানরা মাদকাসক্ত হয়, মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে, এদের কাছে শ্লীল অশ্লীল বলতে কিছু থাকে না। কারণ ওরা তো বনের জানোয়ারের মতো। ওরাই ধর্ষণ করবে, খুন করবে, চুরি করবে, ডাকাতি করবে। পড়ালেখার এ হাল হলে, ওরা কী করবে, চাকরি করতে হবে, কিন্তু কোথায় চাকরি?  ঘটিবাটি বিক্রি করে অযোগ্য লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করে সমাজ বদলের চিন্তা করে। হায় বাংলাদেশ! করুণা হয় আমার। যারা লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে চাকরিতে নিয়োগ পায়, তারা তাদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের পক্ষে দেশের ও সমাজের সেবা করার সুযোগ হয়ে ওঠে না। বিচার চাই, বিচার চাই বলে চিল্লালে কি বিচার হবে? মোটেই না। গোড়ায় গলদ রেখে আগায় পানি ঢাললেই যদি সমস্যার সমাধান হতো তবে এ পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।

টিনএজ সন্তানের কর্মকাণ্ড নিয়ে সবসময় পিতা-মাতা গালমন্দ করতে থাকে, ওদের একে তো শারীরিক মানসিক পরিবর্তনে এক বিপর্যয়ে থাকে তারপর পরিবারের অসহযোগিতা আরও অসহায় করে তোলে। ওদের যদি নারী পুরুষের সম্পর্ক, দৈহিক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে জ্ঞান দেওয়া হতো অবশ্যই ওদের দ্বারা কোনো প্রকার অপরাধ সংঘটিত হতো না। প্রতিটি অপরাধীর ঠিকুজি পর্যালোচনা করলে পারিবারিক অশান্তিই কারণ হিসেবে প্রমাণিত হয়। তাহলে আমরা কি একজন অপরাধীকে সংশোধন হওয়ার সুযোগ করে দেব নাকি ক্রসফায়ার কামনা করব! নাকি যেখান থেকে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা শুরু হয় সেখানেই নজর দেব। অন্ধকার তাড়াতে হলে আলোর প্রয়োজন। এখন এ আলো ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করে।

গুরুতর অন্যায়ের জন্য শাস্তি অপরাধীকে দিতেই হবে। না হলে অপরাধ সংঘটিত হবে, কারণ অপরাধী জানে, এর কোনো শাস্তি নেই। ধর্ষণের ব্যাপারে যদি বলি, তখন মানুষ হাজার দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেউ পোশাককে দায়ী করে, কেউ চলাফেরাকে দায়ী করে, কেউ আবার চরিত্র নিয়ে কাল্পনিক গুজব ছড়িয়ে দেয়। চরিত্র খারাপ বলতে সাধারণত আচরণগত ত্রুটিগুলোকেই বোঝায়। তাহলে সুদ, ঘুষ, খুন, ধর্ষণ, মাদকাসক্তি, চুরি, মিথ্যা বলা, কাউকে বিনা কারণে আঘাত করা, অন্যের সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করা এগুলোই অপরাধ। আসুন, নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে আমাদের সন্তানকে মানবিক শিক্ষা দিই। পাঠ্যপুস্তকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সম্পর্কে বিভিন্ন গল্প, গদ্য, কবিতা অন্তর্ভুক্ত করি।

ইলা লিপি : বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক-এ কর্মরত

ela.lipi87@gmail.com