অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের তিরোধান জাতির অপূরণীয় ক্ষতি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের তিরোধান জাতির অপূরণীয় ক্ষতি

সম্পাদকীয় ৮:৫৮ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২০

print
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের তিরোধান জাতির অপূরণীয় ক্ষতি

কিছু কিছু মৃত্যু পাহাড়ের মতো ভারী। মেনে নেওয়ার মতো নয়। নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে অস্বীকার করার মনোভাব সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক, গবেষক, জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান চলে গেলেন না ফেরার দেশে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

 

বরেণ্য এ শিক্ষাবিদকে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদবিরোধী নানা আন্দোলনে সবসময় সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে বাংলাদেশ। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। শোকবার্তায় মন্ত্রী বলেন, প্রজ্ঞা ও শুদ্ধ চেতনায় দীপ্ত এ মানুষটির চলে যাওয়া দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

বাংলা একাডেমির সভাপতি আনিসুজ্জামানের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসে জটিলতা, পারকিনসন্স ডিজিজ এবং প্রোস্টেটের সমস্যার পাশাপাশি শেষ দিকে তার রক্তেও ইনফেকশন দেখা দিয়েছিল। অসুস্থতা বাড়তে থাকায় গত ২৭ এপ্রিল এই অধ্যাপককে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত ৯ মে তাকে নেওয়া হয়েছিল ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী, সংবিধানের অনুবাদক, দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রবর্তী ছিলেন তিনি। জাতির বিবেকসম এ মানুষটি ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এ টি এম মোয়াজ্জেম ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে স্নাতক সম্মান এবং এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন আনিসুজ্জামান। অনার্সে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৃতিত্বস্বরূপ ‘নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক’ বৃত্তি লাভ করেন।

১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্র উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী আন্দোলন এবং ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত গণআদালতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।

আনিসুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য রচনাবলির মধ্যে ‘স্মৃতিপটে সিরাজুদ্দীন হোসেন, ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ স্মারকগ্রন্থ’, ‘নারীর কথা’, ‘মধুদা, ফতোয়া’, ‘ওগুস্তে ওসাঁর বাংলা-ফারসি শব্দসংগ্রহ ও আইন-শব্দকোষ অন্যতম। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, অলক্ত পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রিতে ভূষিত হয়েছেন। ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ পেয়েছেন।

সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে তাকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের তিরোধান জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। যে বিপুল সৃষ্টিকর্ম তিনি রেখে গেছেন সেগুলোর পঠনপাঠনের মাধ্যমে তার স্বপ্নের দেশ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় হলেই শান্তি পেতে পারে তার বিদেহী আত্মা। তার পুণ্যস্মৃতির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।