দলবেঁধে পিটিয়ে হত্যা

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

দলবেঁধে পিটিয়ে হত্যা

দূষিত ছাত্ররাজনীতির উদাহরণ

সম্পাদকীয়-১ ১০:০০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৮, ২০১৯

print
দলবেঁধে পিটিয়ে হত্যা

দেশের ছাত্ররাজনীতিকে নতুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে আবরার হত্যাকাণ্ড। কেননা আমাদের ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় এখন অতীত হয়ে গেছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ছাত্রনেতাদের পাওয়া যায় না। কারণ এ সময়ে ছাত্ররাজনীতি করা হয় মূল রাজনৈতিক দলের নেতাদের চাটুকারিতার মাধ্যমে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য। আর ছাত্রনেতা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাও বেশ সময়সাপেক্ষ।

ছাত্রসংগঠনের নেতা হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট বয়সসীমা রয়েছে। এ বয়সের মধ্যে নেতা নির্বাচিত হওয়ার তাগিদ থাকায় বছরের পর বছর ইয়ারড্রপ দিয়ে একই শ্রেণিতে ছাত্র হিসেবে থাকা ও ছাত্রত্ব দেখানোর জন্য কোনো একটি বিভাগে নামমাত্র ভর্তি হয়ে থাকা থেকে শুরু হয় ব্যক্তি ছাত্রনেতার ছাত্রজীবনের অধঃপতন। তারপর নিয়ন্ত্রণ করতে হয় কোনো একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ, এরপর প্রতিপক্ষ গ্রুপের সঙ্গে সংঘাতে বা নিজেদের গ্রুপ শক্তিশালী করার জন্য সাধারণ ছাত্রদের প্রথম বর্ষেই সিটের লোভ দেখিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে রিক্রুট করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নির্দিষ্ট কক্ষগুলোতে।

প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এসব কক্ষে সিট বরাদ্দ করার অবৈধ দায়িত্বটি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনই করে থাকে। আর গ্রাম থেকে আসা তীব্র ভর্তিযুদ্ধে জয়ী মেধাবী শিক্ষার্থীটি শুধু একটি সিটের জন্য জিম্মি হয়ে পড়ে এসব ছাত্রনেতাদের কাছে।

নেতাদের কথামতো মিছিল-মিটিংয়ে হাজির না হলে, গেস্টরুম আড্ডায় যোগ না দিলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। শুধু তাই না, ভিন্ন মতাবলম্বী কাউকে পেলেই তাকে তীব্র অত্যাচার করে হল থেকে বিতাড়ন করা হয়। আবার ভিন্ন মতাবলম্বী না হলেও শুধু শাসক দলের গঠনমূলক সমালোচনা করলেই নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ওপর। যখন নির্মমভাবে পেটানো হয় নিরীহ শিক্ষার্থীটিকে, তখন তার আর্তচিৎকারে পুরো আকাশ-বাতাস কেঁপে ওঠে। কিন্তু শুধু হলের সিটটি রক্ষা করার জন্য কেউ এগিয়ে যায় না। এভাবেই দেশসেরা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে ছাত্ররাজনীতির নামে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়।

বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারকে দলবেঁধে পিটিয়ে হত্যার বিস্তারিত পত্রিকায় এসেছে। এমন ঘটনা আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দূষিত ছাত্র রাজনীতির এক নগ্ন উদাহরণ। এখন কে বদলাবে এ নোংরা সংস্কৃতি, সে প্রশ্নই বড়মাপে দেখা দিয়েছে। কেননা বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষ আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

এদিকে ব্যক্তির অপকর্মের দায় এড়াতে গিয়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করাও কোনো সমাধান নয়। কারণ ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন পরিচালনার জন্য যে আধিপত্যমূলক নীতি অনুসরণ করা হয় তারই ফসল হয় এ ধরনের বিপথগামী ছাত্রনেতারা। সবশেষে এত হতাশার মাঝেও আমরা বিচার বিভাগের ওপর আস্থা রেখে আবরার হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।