আগুন কথন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬

আগুন কথন

রায়হান উল্লাহ ৯:৫৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০১৯

print
আগুন কথন

গ্রীষ্মকালে সচরাচর আগুন লাগে। এ সময় বাতাসের ঝাপটা থাকে বেশি। আর একবার আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সহজে নেভানো যায় না। আগুন নিয়ে কিছু লিখতে এসব প্রস্তাবনা।

আগুন কথন বলার সাহস করেছি একটি কারণে। রাজধানীর এফ আর (ফারুক রূপায়ণ) টাওয়ারের ভয়াবহ আগুন চোখের সামনে দেখেছি। দেখেছি আধুনিকতা কীভাবে মানুষকে নরকে ঠেলে দেয়। ভবনটির কোনো সহজ নির্গমন পথ ছিল না। এ রকম ভবন রাজধানীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য।

যে দেশে ২০তলার অধিক ভবন থাকতে পারে সে দেশে ওই ভবনে অনেক কিছুই থাকা জরুরি। জরুরি নির্গমন পথসহকারে ভবনে থাকতে হবে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। এমনকি থাকতে হবে একাধিক পথও। থাকতে হবে ছাদে অবাধ যাতায়াতের সুবিধা। সেখানে থাকতে পারে সুরক্ষিত প্যারাসুট। আমরা এও আশা করতে পারি, ওই দেশের ফায়ার সার্ভিস সুদক্ষ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। তাদের থাকবে বিশেষ বিশেষ কিছু সুবিধা। যেমন- উদ্ধার বিমান। যা ছাদেই অবতরণ করবে। মানুষ নিয়ে উড়ে নিরাপদে ফেলে আবারও ঠিক ওই জায়গায় আসবে। যা চলবে ক্রমাগত। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক বিভাগ থাকবে। একটি বিভাগ বিশাল জাল কিংবা ফোম চারপাশের রাস্তায় বিছিয়ে দেবে। যাতে সহজেই মানুষ লাফিয়ে পড়বেন। একটু আহতও হবেন না। এমন ভাবা কি বেশি হলো? হয়তো সোনার বাংলাদেশে এসব ভাবনা পাগলের প্রলাপ মনে হতে পারে। তাই যদি হয় তবে কেন পাঁচতলার ওপরে ভবন উঠতে দেওয়া হয়?

এফ আর টাওয়ারে আগুনের ঘটনায় অনেক বিচ্যুতি ধরা পড়েছে। এর কিছুদিন আগেই পুরান ঢাকায় হয়ে গেল আরেকটি ভয়ঙ্কর আগুন লাগার ঘটনা। শুধু তাই নয়, কিছুদিন ধরে একের পর এক আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবু হুঁশ ফেরেনি আমাদের।

এফ আর টাওয়ারের পাশে বসতি হরাইজনে দৈনিক খোলা কাগজের বার্তা কার্যালয়। এক বছর দৈনিকটিতে সহ-সম্পাদক পদে কাজ করছি। ফলে দেখছি পুরো কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের প্রতিটি ভবন যেন যমজ কিংবা জট। কোনো ফাঁকফোকর নেই। এসব ভবন নকশা কীভাবে ছাড় পায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। প্রতিটি ছাড়ে কাদের স্বাক্ষর থাকে? তারা কে কোথায় আছেন, এসব জানা জরুরি। কিন্তু সব সম্ভবের এই দেশে আমরা এসব না খুঁজে, খুঁজি কে কোন দলের। ফলে দুর্ঘটনায় পুড়ে মরেন ভাইবোন সহপ্রাণ। আর চোর পালালে আমাদের বুদ্ধি বাড়ে। প্রকৃতই কি বাড়ে? একটুও না। আমরা বাগাড়ম্বর করার চেষ্টা করি। হয়তো আমরা সবকিছু থেকে মজা পাই। প্রাণ পুড়লেও হয়তো। না হয় শয়ে শয়ে মানুষ হাঁ করে তাকিয়ে চাইনিজ জঞ্জালে ভিডিও কিংবা আলোকচিত্র ধারণ করবেন কেন? তারা সবাই এ যুগের লেয়ার লেভিন হয়ে যেতে চান। অথচ এসব না করে দূরে সরে পড়লে রাস্তায় নির্ঝঞ্ঝাটে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি কিংবা অ্যাম্বুলেন্স যেতে পারে। কিন্তু আমরা বড় বিস্ময়কর জাতি। হয়তো ধারণ করা ছবি কিংবা ভিডিও দেখিয়ে পরিবারের কাছে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে চাই আমরা।

এ আগুনে আরও কিছু প্রশ্ন জাগে। ওই ভবনে রাখা অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারগুলো কি ব্যবহার করা হয়েছে? না এগুলো প্রাণ হরণে ব্যবহার হয়েছে। আগুন লাগার পর অব্যবহৃত সিলিন্ডার অবশ্যই বিস্ফোরিত হয়েছে। তাতে বিপরীতটাই হয়েছে। এগুলো অনেকের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এফ আর টাওয়ারে আটকেপড়া একজনকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার খবর শুনেছি। তিনি বলেছেন, ছাদে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। এমন কেন হবে? বহুতল ভবনের ছাদ থাকবে উন্মুক্ত।

এবার আসা যাক, সম্প্রতি আরও কিছু আগুনের ঘটনায়। রাজধানীর গুলশান-১-এ ডিএনসিসি মার্কেটে লাগা আগুনে ২১২টি দোকান পুড়ে গেছে। পোড়া দোকানের ছাইয়ের মধ্যেই কিছু মানুষকে দেখা গেল পেট পুরতে। একটি ডিমের দোকান থেকে পোড়া ডিম কুড়িয়ে একের পর এক খেতে দেখা গেল কয়েকজনকে। কাউকে কাউকে ডিম পকেটে পুরে নিয়ে যেতেও দেখা গেছে। একজন বললেন, দোকানওয়ালার তো সব গেছেই। এখন এই পোড়া ডিম নষ্ট হচ্ছে, তাই খেয়ে নিচ্ছি। বুঝুন অবস্থা। অন্যদিকে পোড়া ও বাদ পড়া মালামাল বিক্রি করতেও দেখা গেছে। এই আমাদের মানবিকতা কিংবা সততা!

আগুন কথনে কতকিছুই বলা যায়। খবর বেরুচ্ছে- নয় বছর আগে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল পুরান ঢাকার সদরঘাটের ইস্ট বেঙ্গল সুপার মার্কেটে, এখনো অগ্নিনিরাপত্তার পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেই বহুতল বাণিজ্যিক ভবনটিতে। এবার নোটিস ঝুলিয়ে দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।

একটা ঘটনা ঘটলে নগদ হা-হুতাশ, পরে সব ঠিকঠাক। খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমাচ্ছি আমরা। এভাবেই প্রাণ যাবে। চাইনিজ ফোনসেটের কল্যাণে আমরা হয়ে যাব পুরোদস্তুর সংবাদকর্মী। ইউটিউব ভরে যাবে অগ্নিকাণ্ডের ক্লিপে। মালামাল লুট হবে। আগুনপোড়া ডিম খাওয়া হবে। দল দেখে মানুষকে হেনস্তা করা হবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। ভবন নির্মাণ আইন মানা হবে না। আইন দেখিয়ে লুটেরা ফায়দা হাসিল করবে। তাদের বিত্ত-বৈভব হবে। মানবতা ধুঁকবে। কিন্তু এর মাঝেই একজন নাঈম ইসলাম দেখাবে গলদটা আসলে কোথায়?

ছোটবেলায় চৌবাচ্চার অঙ্ক আমার সবাই কষেছি। এক নল দিয়ে পানি পড়ছে, আরেক নলে উঠছে। যদি ওঠার পরিমাণ বেশি হয় তবে সব ছাপিয়ে কোনো না কোনো সময় চৌবাচ্চা ভরবে। না হয় অনন্তকাল পানি তুললেও চৌবাচ্চা ভরবে না। প্রথম দিকে দেখেছি, ফায়ার সার্ভিসের পানির তোড় যেন টিউবওয়েলের বেগের মতো!

একটি গল্প বলা যাক, একজন চাইনিজ ফেরি কিংবা জাহাজযাত্রায় একটি ঘড়ি পানিতে ফেলে দিলেন। তার ভাবখানা এমন, আরও অসংখ্য আছে। তৎক্ষণাৎ একজন বাঙালি তার সন্তানকে ফেলে দিলেন। অবাক ভাব চাইনিজের। এ কী করলেন মানুষটি। বাঙালি ভাব নিলেন এ আমাদের অসংখ্য আছে। মানে মানুষ নিয়ে আমরা বিপাকে। অথচ মানুষই শক্তি। গল্পটির ভিন্ন রূপান্তরও আছে। ওই বালকটি ওই ঘড়িটি নিয়ে একটু পর ভেসে উঠল। চাইনিজ হতবাক। তেমনি প্রাণের দরে আমরা নিজের লাভ খুঁজে নেই। যেমন আগুন লাগলে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল স্বার্থ হাসিল করে নেয়। লুটপাট ও চুরিতে অংশ নেই। আলু কিংবা ডিম পোড়া খাই। হয়তোবা এসব না হলে অনেকে বিত্ত-বৈভবের মালিক হতেন না।

তাই আগুনেও তাদের ফাগুন আসে। তারা দেখে না একদিকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ও মানুষের অবাক চাহনি। মানুষ, আরও এগিয়ে বাংলার মানুষ এমন কেন? জন্মন্তারের প্রশ্ন।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক
raihanullah12@gmail.com