উপেক্ষিত নারী উদ্যোক্তা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বেসরকারি ব্যাংক ঋণ

উপেক্ষিত নারী উদ্যোক্তা

জাফর আহমদ ১০:৩১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০১৮

print
উপেক্ষিত নারী উদ্যোক্তা

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবদান বাড়লেও নারী উদ্যোক্তারা উপেক্ষিত হচ্ছেন। ফলে তাদের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এর ফলে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেটার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই সম্পর্কিত প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই স্পেশাল বিভাগের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ৩১ হাজার ৪১৪ নারী উদ্যোক্তাকে ঋণ দিয়েছে। বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৪০৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক ঋণ দিয়েছে ২০ হাজার ৪১৪ নারীকে। বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ৮০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে ৫৪টি দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ৩০ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ দিয়েছে ১০ হাজার ৯২৯ নারীকে। ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৩২৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। আর্থিক খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো বড় বড় গ্রাহক খুঁজে তাদের ঋণ দেয়। যেখানে মুনাফা বেশি ও পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সেখানে বিনিয়োগ করে।

নারী উদ্যোক্তারা তুলনামূলক দেওয়া ঋণ ছোট আকারের, ঋণগ্রহীতা হিসেবে তারা নতুন হওয়ার কারণে ঝুঁকিও বেশি। সে কারণে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে কম আগ্রহী।

সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও নারীদের ঘরের বাইরের বের হয়ে আসার মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতে নারীর অবদান বৃদ্ধির জন্য সরকার নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে নারীদের প্রশিক্ষণ, অর্থায়নসহ বিভিন্ন রকম উদ্যোগ রয়েছে। নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ প্রক্রিয়া শেখানোর পর ব্যাংকের কাছে ঋণের জন্য পাঠানো হয়।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, এসএমই ফাউন্ডেশন, নারী চেম্বারসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। এরপরও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার বিষয়টি কঠিন হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে নারী উদ্যোক্তারা কিছুটা সুবিধা করতে পারছে; বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ সুবিধাটুকুও পাচ্ছে না।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সামস উল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান ও অর্থায়নে সরকারের পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালন করতে হয়। এক্ষেত্রে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হয়। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীরা এগিয়ে এলে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নারী উদ্যোক্তাদের বেশি ঋণ দেওয়া হয়।

তিনি নিজের ব্যাংকটির উদাহরণ দিয়ে বলেন, অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে তিনজন নারী পরিচালক আছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা আছে প্রতি শাখায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নিবেদিত একজন করে কর্মকর্তা থাকবেন এবং তিনি হবেন নারী। যাতে কোনো নারী গ্রাহক ‘নারী’ হওয়ার কারণে ব্যাংকে এসে কোনোভাবে নিরুৎসায়িত না হন। আমরা এ নির্দেশনা পালন করছি। সরকার অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের যে পথনকশা প্রণয়ন করেছে এবং এ ব্যাপারে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কাজ করার কারণে নারী উদ্যোক্তা, কৃষক ও কম মুনাফা কিন্তু অর্থনীতিতে এর ভূমিকা বেশি, এমন খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই সম্পর্কিত প্রতিবেদনে এ চিত্রই উঠে এসেছে বলে মনে করেন এই প্রধান নির্বাহী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ৫৪৭ নারী উদ্যোক্তাকে ৪০ কোটি ৪২ লাখ ঋণ দিয়েছে। ৯ বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ১৩০৩ নারীকে ঋণ দিয়েছে ২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ৩২ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক বিতরণ করেছে ৪২৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ৮ ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ১৪৮ নারী উদ্যোক্তা দিয়েছে ৬৯৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ২ হাজার ২৮১ জনকে দিয়েছে ১৩০ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রাম বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. সেলিম খোলা কাগজকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শাখা বেশি এবং এসব ব্যাংকের শাখা পল্লী অঞ্চলে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রশ্নে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর চেয়ে সরকারি ব্যাংকগুলো বেশি মনোযোগ দেয়; এ ব্যাপারে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মসূচি এবং নীতি বাস্তবায়নের তাগিদ বেশি থাকে। এ কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ বেশি হতে পারে।