বিদেশি মুদ্রায় ঋণ গ্রহীতারা বিপাকে

ঢাকা, সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

বিদেশি মুদ্রায় ঋণ গ্রহীতারা বিপাকে

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
🕐 ১২:২৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০২১

বিদেশি মুদ্রায় ঋণ গ্রহীতারা বিপাকে

ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনে বিদেশি মুদ্রায় ঋণ গ্রহীতা দেশি উদ্যোক্তারা সংকটে পড়েছে। কম সুদে বিদেশি ঋণ নেয়া এ সব দেশি উদ্যোক্তা স্বাভাবিক সময়ে যে হারে ঋণ শোধ করত এখন তার চেয়ে কমপক্ষে ১০ শতাংশ হারে বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে।

দেশি অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদ হার বেশি। পাশাপাশি এর প্রসেসিং চার্জও বেশি। এ সব দেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে হলে ১২ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হয়। পক্ষান্তরে বিদেশি সোর্স থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হলে এর ঋণের সুদ হার তুলনামূলক কম। তবে এ ঋণ নিতে হলে তুলনামূলকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানই ঋণ পেয়ে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিল্প উৎপাদন বাড়ছে। বাড়ছে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা। উন্মোচন হয়েছে সম্ভাবনার নতুন দ্বার। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থায়ন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থায়নের জন্য দেশি উৎসের পাশাপাশি এখন বেশিসংখ্যক উদ্যোক্তা বিদেশি অর্থের ঋণে ঝুঁকছেন। বলা হচ্ছে দেশের তুলনায়, বিদেশি ঋণে সুদহার কম। তবে ঋণের অর্থ ডলার বা অন্য কোনো মুদ্রায় দেশে আসে আর তা পরিশোধও করতে হয় বিদেশি সেই মুদ্রায়। এ কারণে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার যদি বেড়ে যায়, তাহলে ঋণ গ্রহীতাদের বেশি দামে তা কিনতে হবে। ফলে তাদের প্রত্যাশিত অর্থের চেয়ে বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই ঘটনাটিই ঘটছে সম্প্রতি।

টানা কয়েক বছর টাকার সঙ্গে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলেও এখন পরিস্থিতি অন্য রকম। ডলারের দর হঠাৎ করেই এখন চড়া। আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলার বিনিময় হার এখন ৮৫.৮০ টাকা। ৩-৪ মাস আগেও ব্যাংকে বিনিময় হার ৮০ বা ৮১ টাকা ছিল। এক বছর আগে ছিল ৭৬ থেকে ৭৭ টাকা। ফলে সে সময় যারা ঋণ নিয়েছেন ঋণ গ্রহীতাদের প্রত্যাশিত অর্থের চেয়ে বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে।

বিদেশি উৎস থেকে ঋণ গ্রহীতাদের জন্য এটা বেশ সমস্যার বলে মনে করেন দেশের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক ও তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা নেতা শোভন ইসলাম। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, বিদেশ থেকে তুলনামূলক কম ইন্টারেস্টে ঋণ পাওয়ার কারণে অনেক উদ্যোক্তাই এই ঋণ নিয়েছে। তারা তুলনামূলক কম সুদহারে ঋণ নিলেও দুই থেকে তিন ডলারের বেশি হারে শোধ করতে হয়। দেশের বড় বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাড়াও প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৪০ শতাংশ রপ্তানিকারক এ ধরণের ঋণ গ্রহণ করে থাকে। তারা সবাই এখন টাকা অবমূল্যায়নজনিত সমস্যায় জর্জরিত।

পাঁচ বছর আগেও ২০১৬ সালের এপ্রিলে ৭৬ টাকা ৬০ পয়সাতেও ডলার কেনা গেছে। প্রায় তিন বছর ঘুরে-ফিরে একই দর ছিল। তবে সে সময়ের চেয়ে ১০ শতাংশের বেশি মূল্য হারায় টাকা। ফলে ৫ বছর আগে যারা বিদেশ থেকে ঋণ এনেছেন, তাদের বিনিময় হারের কারণে ১০ শতাংশ বেশি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে সুদহার। আবার ঋণ দেশে ডলারে এলেও ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশি মুদ্রাতেই তা পান উদ্যোক্তারা। এখানেও ডলার প্রতি ২০ থেকে ৩০ পয়সা কমিশন কেটে রাখা হয়। আবার ঋণ পরিশোধে ডলার কেনার সময়ও অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ পয়সা বেশিতে কিনতে হয়।

বছর পাঁচেক আগেও বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১২ শতাংশের বেশি থাকায় বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও বিদেশি ঋণে ঝুঁকতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। তবে এখন দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ভালো ঋণদাতা ও বড় অঙ্ক হলে এর চেয়ে কম সুদেও ঋণ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশ থেকে দেশি উদ্যোক্তাদের ঋণ সংগ্রহের সুযোগ প্রায় চার দশক আগেই করে দেয়া হয়েছে। ১৯৮৫ সালে ‘অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট’ নামে ব্যাংকের আলাদা বিভাগ গঠন করা হয়। বর্তমানে ৩৬টি ব্যাংক এই বিভাগ গঠন করে ঋণ বিতরণ করছে। প্রথম দিকে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা এ ঋণ নিলেও পরে অন্য খাতের উদ্যোক্তারাও এই সুবিধা নিতে শুরু করেন। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি বিদেশি ঋণ নেওয়ার পথ আরও প্রশস্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বিদেশি মালিকানাধীন সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানও মূল কোম্পানি (প্যারেন্ট) থেকে ঋণ নিতে পারবে। তবে এ সুবিধা ট্রেডিং ব্যবসার জন্য প্রযোজ্য হবে না। উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রম শুরু থেকে ছয় বছর পর্যন্ত এ সুবিধা নেয়া যাবে। আগে এ সুবিধা তিন বছর পর্যন্ত নেয়া যেত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে ব্যক্তি বা বেসরকারি পর্যায়ে মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ঋণ ছিল ৬৩ হাজার দুই কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে ঋণ ১০ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা বেড়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা জানান, তুলনামূলক কম সামর্থ্য এমন উদ্যোক্তারা রপ্তানি আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ডকুমেন্টের বিপরীতে বিদেশি সোর্স থেকে ঋণ নিয়ে পণ্য প্রস্তুত করে। প্রচলিত বাজার রেটে এ ডলার সংগ্রহ করে রপ্তানি করলেও শোধ করার সময় তা ৮৬ থেকে ৮৭ টাকা দরে ডলার কিনে এই ঋণ পরিশোধ করা লাগে। তুলনামূলকম কম সামর্থ্যবান উদ্যোক্তারা এটা করে ক্ষতিগ্রস্ত হন। সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ার ফলে তারা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 
Electronic Paper