ই-কমার্স গ্রাহকের চোখে শর্ষে ফুল

ঢাকা, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১ | ৩ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

ই-কমার্স গ্রাহকের চোখে শর্ষে ফুল

মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে, টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, ভোক্তা অধিকারে জমেছে ২০ হাজার অভিযোগ, ই-অরেঞ্জ গ্রাহকরা রাস্তায় পুলিশের লাঠিপেটা

প্রীতম সাহা সুদীপ
🕐 ৯:০৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১

ই-কমার্স গ্রাহকের চোখে শর্ষে ফুল

দেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমছে। অন্তত ১২টি ই-কমার্স কোম্পানি ব্যাপক মূল্যছাড়ে পণ্য বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মালিকপক্ষসহ কয়েকজন অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেফতারও হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে টাকা বিনিয়োগ করে চোখে সর্ষে ফুল দেখতে শুরু করেছেন ই-কমার্স গ্রাহকরা।

যারা এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করে পণ্য হাতে পাননি, তারা রাস্তায় নেমে এসেছেন। সড়কে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করে, অঝোরে চোখের পানি ঝরিয়েও টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। সর্বস্ব হারিয়ে অনেক গ্রাহক মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ই-অরেঞ্জে টাকা খাটিয়ে বিপদে থাকা সহস্রাধিক গ্রাহক গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করেন। তারা প্রেস ক্লাব থেকে মৎস্য ভবনের দিকে এগিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। এরপর সড়কেই অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের সরিয়ে দেয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে দলাদলির কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তারপর আমরা লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেই।

গ্রাহকদের মানবেতর জীবন-যাপন, নেই টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা

ই-অরেঞ্জ নামে যে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে গতকাল গ্রাহকরা রাস্তায় নেমেছিল, সেই কোম্পানির মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমান, কোম্পানির চিফ অপারেটিং অফিসার আমান উল্লাহ বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। আর ভারতে রয়েছেন এই চক্রের অন্যতম মূলহোতা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা সোহেল রানা।

ই-অরেঞ্জের প্রতারণার শিকার আমিনুর রহমান গতকাল খোলা কাগজকে জানান, তিনি পণ্য কিনতে ই-অরেঞ্জকে ৪ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। ওই দামে তার বাজারমূল্যে প্রায় আট লাখ টাকার পণ্য পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো পণ্যই তিনি বুঝে পাননি। টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না। আগের মালিক কোম্পানি হাতবদল করে বিদেশে চলে গেছে। নতুন মালিকদের কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কোম্পানি এখন পুরোপুরি বন্ধ।

মৌ আক্তার নামের আরেক গ্রাহক জানান, সদ্য নতুন সংসারে প্রবেশ করার পর ফ্রিজ, টিভিসহ অন্যান্য গৃহস্থালির পণ্য কিনতে ই-অরেঞ্জে সাত লাখ টাকা দেন তিনি। কোনো পণ্য পাননি, এখন কোম্পানি ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তিনি বলেন, ‘সরকারকে এই প্রতারণার দায় দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই। ই-কমার্সের নামে প্রকাশ্যে দিবালোকে এ ধরনের প্রতারণা কীভাবে চলছিল এতদিন?’

ইভ্যালি সিইও রাসেলকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ

এদিকে ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা মামলায় ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রাসেলের রিমান্ড নামঞ্জুর করেছেন আদালত। সেই সঙ্গে তাকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনে রাসেলের পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুল হকের আদালত রাসেলকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।

ইভ্যালির বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হচ্ছে

বিভিন্ন নাটক ও অনুষ্ঠানের স্পন্সর ও ব্র্যান্ডিং বাবদ ইভ্যালি থেকে প্রায় ৬০ লাখ টাকা পাবে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ক্রাউন এন্টারটেইনমেন্ট ও ক্রাউন ক্রিয়েশন্স। পাওনা এই টাকা আদায়ে এবার আইনের আশ্রয় নিতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠান দুটি।

ক্রাউন এন্টারটেইনমেন্টের ডেপুটি সিইও মো. তাজুল ইসলাম ও ক্রাউন ক্রিয়েশন্সের সিইও সৈয়দ ইকবাল স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, ২০১৯ সাল থেকে ইভ্যালির নিয়োজিত বিজ্ঞাপনী এজেন্সি ফ্যাক্টর থ্রি সলিউশনস ও সরাসরি ইভ্যালির কার্যাদেশ অনুযায়ী বিভিন্ন নাটক-অনুষ্ঠানের ইভ্যালি স্পন্সর করে। এর প্রেক্ষিতে নিয়মমাফিক বিল জমা দেওয়ার পর আংশিক টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এরই মাঝে ইভ্যালির কাছে আমাদের প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পাওনা ৬০ লাখ টাকার বেশি দাঁড়িয়েছে; যা পরিশোধের ক্ষেত্রে ইভ্যালি কর্তৃপক্ষ নানা ধরনের টালবাহানার মাধ্যমে কালক্ষেপণ করছে। আমাদের প্রতিষ্ঠান পাওনা টাকা আদায়ের লক্ষ্যে ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মোহাম্মদ রাসেলসহ ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মরত প্রশাসন, হিসাব ও অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তাসহ ইভ্যালির বিজ্ঞাপনী এজেন্সি ফ্যাক্টর থ্রি সলিউশন্সের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আমাদের আইনজীবীকে পরামর্শ দিয়েছে। এই বিষয়ে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের পথেই কিউকম!

পাওনাদার ও গ্রাহকদের চাপ সামলাতে না পেরে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মতো ই-কমার্স সাইট কিউকমের কার্যালয়ও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গত বুধবার মধ্যরাতে ফেসবুক লাইভে এসে অফিস বন্ধ করে বাসায় বসে কাজ করার ঘোষণা দেন এই কোম্পানির উদ্যোক্তা ও সিইও রিপন মিয়া এবং তার সহযোগী সাবেক রেডিও জকি (আরজে) নিরব। এই সময় গ্রাহকদের তাদের বাসাবাড়ির নিচে ভিড় না করার অনুরোধও করেন তারা।

যদিও ইভ্যালির অনুকরণে যাত্রা শুরু করা কিউকমও গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আটক করে রেখেছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের মন্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে।

অর্ধেক মূল্যে পণ্য দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মোটরসাইকেলসহ নানা ধরনের সৌখিন পণ্যের অর্ডারই বেশি নিয়েছে কিউকম। কয়েক সপ্তাহ আগে কিউকমের তেজগাঁও কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শত শত গ্রাহক তাদের পণ্য অথবা টাকা বুঝে পেতে ভিড় জমিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর নতুন একটি তারিখ নিয়ে খালি হাতেই ফিরছিলেন তারা।

চারজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের সবাই বাজাজ কোম্পানির বিভিন্ন মূল্যের মোটরসাইকেল কিনতে টাকা জমা দিয়েছেন। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে কাস্টমার কেয়ার থেকে ২/৩ বার তারিখ পরিবর্তনের পরও বাইক না পেয়ে তারা চলে আসেন অফিসে। এই পরিস্থিতি চলার মধ্যেই বুধবার কার্যালয়গুলো বন্ধ করে দিয়ে ‘হোম অফিস’ চালুর ঘোষণা দেয় কিউকম।

ভোক্তা অধিকারে জমেছে ২০ হাজার অভিযোগ

ইভ্যালি, দারাজ, ই-অরেঞ্জের মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত ৪ বছরে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে মোট ১৯ হাজার ৩০৪টি অভিযোগ জমা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ২৫৭টি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট অভিযোগের ৬৩.৪৯ শতাংশ। অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (তদন্ত) শাহনাজ সুলতানা এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অভিযোগ ইভ্যালির বিরুদ্ধে। এ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে মোট ৭ হাজার ১৩৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। নিষ্পত্তি হয়েছে ৪ হাজার ৪৯৫টি। নানা কারণে অনিষ্পন্ন রয়েছে ২৬৬৪টি। এছাড়া দারাজের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৫১টি, সহজ ডট কমের বিরুদ্ধে ৯৩টি, আজকের ডিলের বিরুদ্ধে ১৮২টি, ফুড পান্ডার বিরুদ্ধে ৩২২টি, চালডালের বিরুদ্ধে ১৯০টি, প্রিয়-শপের বিরুদ্ধে ৬২৬টি, ফাল্গুনী ডটকমের বিরুদ্ধে ৬৪৪টি, অথবা ডটকমের বিরুদ্ধে ১৮৬টি, উবারের বিরুদ্ধে ১২৮টি, পাঠাওয়ের বিরুদ্ধে ২৬৭টি, বিক্রয় ডটকমের বিরুদ্ধে ১৭টি, নিরাপদ ডট কমের বিরুদ্ধে ১১৫টি, ই-অরেঞ্জ ডটকমের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৬৪৩ (প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ নিষ্পত্তির হার ১.২৫ শতাংশ), রকমারি ডটকমের বিরুদ্ধে ৩৮টি, ধামাকার বিরুদ্ধে ৩২৩টি, আদিয়ান মার্টের বিরুদ্ধে ১১৬টি, আলেশা মার্টের বিরুদ্ধে ২০টি, মনোহর ডটকমের বিরুদ্ধে ২৫টি, দালাল প্লাসের বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে ৪ হাজার ৯৮২টি অভিযোগ জমা পড়েছে অধিদফতরে। এর মধ্যে প্রায় ৮৬ ভাগ নিষ্পত্তি হয়েছে।

 
Electronic Paper