বস্ত্রে কমেছে, বাড়ছে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বিনিয়োগের মানচিত্র বদল

বস্ত্রে কমেছে, বাড়ছে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে

জাফর আহমদ ১০:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৮

print
বস্ত্রে কমেছে, বাড়ছে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে

দেশের বিনিয়োগের মানচিত্র বদলে গেছে। এক দশক আগে যেখানে মোট স্থানীয় বিনিয়োগের অর্ধেক হতো বস্ত্রখাতে, কৃষি প্রধান দেশ হওয়ার পরও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ কম হতো। বাংলাদেশ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যে দেখা গেছে, বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বেড়েছে। আর কমে গেছে বস্ত্র শিল্পে।

বিষয়টিকে শিল্পের বহুমুখীকরণ ও কৃষিতে সরকারে মনোযোগ বৃদ্ধির ফসল বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান কৃষিখাতে। এ কারণে কৃষিকে আধুনিকায়ন ও খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা সৃষ্টিতে সরকারের নীতির কারণে কৃষিভিত্তিক বিনিয়োগ বেড়েছে।  
তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬-৭ অর্থবছরে মোট ১,৯৩০টি বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে বস্ত্রখাতে ছিল ১,২৭০টি এবং কৃষিভিত্তিক খাতে ছিল ৮৮টি। ২০০৭-৮ অর্থবছরে ১,৬১৫টি প্রস্তাবের বস্ত্রখাতে ছিল ৯৪২টি এবং কৃষিতে ছিল ৮৩টি। ২০০৮-৯ অর্থবছরে ১,৩৩৬টি প্রস্তাবের মধ্যে বস্ত্রখাতে ছিল ৭৪০ এবং কৃষিতে ৮৭টি। এরপর থেকে বিনিয়োগের মানচিত্র ক্রমান্বয়ে বদলে যেতে থাকে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেখা যায়, মোট ১,৪৭০টি বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে কৃষিভিত্তিক ১৩৯ আর বস্ত্রে হার কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৬৪২টিতে।
২০১০-১১ অর্থবছরে ১,৭৪৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে কৃষির ১৫৫ আর বস্ত্রের ৬৮৬টি। ২০১১-১২ অর্থবছরে ১,৭৩৫টি প্রস্তাবের মধ্যে ১৬১টি কৃষি এবং ৬৬২টি বস্ত্রে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১,৪৫৭টি প্রস্তাবের মধ্যে ১১১টি কৃষিতে আর বস্ত্রে ৫২৩টি। পরের বছর ১,৩০৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ১১৮টি কৃষিতে এবং বস্ত্রে প্রস্তাব আসে ৩৪৮টি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট ১৩০৯টি বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে কৃষির ১৪০ আর বস্ত্রে বিনিয়োগ হয় ২১৫টি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১,৫১১টি প্রস্তাবের মধ্যে কৃষিজাত শিল্পে ওঠে ২০৯টি এবং বস্ত্রে মাত্র ৭৭টি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১,৫৭৮টি বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে কৃষিভিত্তিক শিল্পে প্রস্তাব বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৭ এবং বস্ত্র নেমে যায় ১২৬টিতে এবং সবর্শেষ গত বছরে ১,৪৮৩টি বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে কৃষি ভিত্তিক শিল্পে ১৯৭টি আর বস্ত্র খাতে ছিল ২০৪টি।   
এ বিষয়ে ড. আতিউর রহমান বলেন, ২০১০ সালে থেকে সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মর্সূচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কৃষিতে ব্যাংকিং খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে উদ্যোগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতি-কৌশল গ্রহণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থে কৃষিতে বিনিয়োগ হওয়ার কারণে কৃষিভিত্তিক শিল্পতে বিনিয়োগের চিত্র বদলে গেছে।
বড় বড় কিছু আধুনিক কৃষি ফার্ম তৈরি হয়েছে। আমসহ বিভিন্ন প্রকার অর্থকরী ফসল প্রক্রিয়াকরণে প্রচুর বিনিয়োগ হয়েছে। মূল্য সংযোজন হয় এমন ফসল উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নানামুখী নীতি-কৌশলও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন কৃষিখাতে ব্যাংকের অর্থায়নের এ নতুন যুগ সূচনাকারী।
তিনি বলেন, মাছ, গবাদি পশু ও বিভিন্ন প্রকার ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের দাম নিশ্চিত করতে সরকার নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছে। উৎপাদন বৃদ্ধিতে গবেষণার জন্য বাড়ানো হচ্ছে অর্থ। এসব কারণে বেড়েছে উৎপাদন। আর এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ গড়ে উঠেছে। এর ফলে কৃষিজাত শিল্পে বিনিয়োগ বদলে গেছে।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী বিনিয়োগ প্রস্তাব কমলেও বিপরীতে অর্থের পরিমাণ মোটামুটি স্থির রয়েছে। তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬-৭ অর্থবছরে বস্ত্রখাতে ১,২৭০টি বিনিয়োগ প্রস্তাবের বিপরীতে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৪৮ মিলিয়ন টাকা প্রস্তাব হয়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যখন বস্ত্রখাতে বিনিয়োগ প্রস্তাব সর্বনিম্নে নামে তখন ৭৭টি বিনিয়োগ প্রস্তাবের বিপরীতে টাকার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৯ হাজার ১১৭ মিলিয়ন টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২৬টি প্রস্তাবের বিপরীতে অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭০৫ মিলিয়ন টাকা এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০৪টি বিনিয়োগ প্রস্তাবের বিপরীতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯২ মিলিয়ন টাকার প্রস্তাব আসে। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বস্ত্রখাতে বিনিয়োগ প্রস্তাবে প্রকল্প সংখ্যা কমলেও প্রস্তাবের বিপরীতে টাকার পরিমাণ বেড়েছে।
এ বিষয়ে ড. আতিউর রহমান বলেন, বস্ত্র খাতের শিল্পগুলো এখন আগের চেয়ে অনেকটা আধুনিক। এ শিল্প আধুনিকায়ন হওয়ার কারণে উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু কারখানা বাড়েনি। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় রানা প্লাজা ধসের পর। বস্ত্র শিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও পরিবেশের বিষয়টি উঠে আসার কারণে সক্ষম কারখানাগুলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে। কিন্তু সে হারে নতুন করে আর বিনিয়োগ আসেনি। পুরাতন কারখানাগুলো আধুনিক কারখানাতে রূপান্তর হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বিশ্বের ১০টি শ্রমিকের কর্মপরিবেশসম্মত ও সবুজ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের ৭টি তৈরি পোশাক কারখানা। আরও  প্রায় ৩০০ কারখানা সবুজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।