২৫১৪৩ কোটি টাকার মূলধন গায়েব

ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ৯ কার্তিক ১৪২৫

১০ ব্যাংকের তুঘলকি কাণ্ড

২৫১৪৩ কোটি টাকার মূলধন গায়েব

জাফর আহমদ ১০:৩১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৩, ২০১৮

print
২৫১৪৩ কোটি টাকার মূলধন গায়েব

ঋণ পুনঃতফসিল করার প্রভাবে মূলধন ঘাটতি মেটাতে পারছে না ১০টি ব্যাংক। এর মধ্যে সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানার ব্যাংক, বাকি তিনটি বেসরকারি খাতের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১০ ব্যাংক মূলধনের ২৫ হাজার ১৪২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা গায়েব হয়েছে ।

তিন মাস আগে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে মূলধন ঘাটতি বেড়েছে ১ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষে এগুলোর মধ্যে ৯ ব্যাংকে সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ছিল। ছয় মাসের ব্যবধানে মূলধন ঘাটতি বাড়ে  ৫,৬৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা।  
২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত গত ৫ অর্থবছরে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দিয়েছে। তবে গত অর্থবছর রূপালী এবং বেসিক ব্যাংক যেহেতু সিআরআর রক্ষা করতে পারেনি তাই ব্যাংক দুটিকে কোনো মূলধন জোগান দেওয়া হয়নি। গত অর্থবছরে জনগণের করের টাকা থেকে এক হাজার ৮৫০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যাংকের দক্ষতা না বাড়িয়ে জনগণের করের টাকায় বারবার মূলধন জোগান নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত মূলধনে ভর করে ব্যাংকিং খাতে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ কমেছে। কিন্তু এরপরও ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা।    
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ৬ ব্যাংকের পাঁচটি মূলধন ঘাটতিতে। এ খাতের ব্যাংকের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড মূলধন ঘাটতিতে নেই। ব্যাংকটির ৬৬৭ কোটি টাকা মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে। তবে বাকি ৫টির মূলধন ঘাটতি ১৪ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি এক হাজার ৪১৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৩ হাজার ১০৬ কোটি ২২ লাখ টাকা, জনতা ব্যাংকের ২ হাজার ১৯৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের এক হাজার ২৯৩ কোটি ৮৯ টাকা ঘাটতি। আর সোনালী ব্যাংকের মূলধন নাই ৬ হাজার ৬০১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবার প্রথমবারের মতো মূলধন ঘাটতির তালিকায় নাম লিখিয়েছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। গত বছর ব্যাংকটিতে বড় পরিবর্তন আসে। চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ব্যাংকটির মালিকানায় আসে। গত মার্চ প্রান্তিকে ব্যাংকটি প্রথম নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হয়। প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতিতে পড়ে ব্যাংকটি। জুন শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
গ্রুপটির মালিকানায় থাকা আরেক ব্যাংক বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড অবশ্য আগে থেকেই মূলধন ঘাটতিতে ছিল। তবে ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে। জুন শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০১ কোটি ৯৯ লাখ  টাকা। এ ছাড়া আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক হাজার ৫২৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। হিসাব মতে, বেসরকারি তিন ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৭২ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর দুটিই মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক মূলধন খেয়ে ফেলেছে ৮ হাজার ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মূলধন নেই ৬৪৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের মূলধন নাই ৮ হাজার ৬৫৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।   
গত মার্চ মাস শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। উল্লিখিত সময় ব্যাংক ব্যবস্থায় মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ লাখ ২২ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৮০ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৬ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মূলধন ঘাটতি বাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক গত মার্চে নতুন করে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ১৫৭ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। মার্চে এসে ৩৩৭  কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে। আর জুন শেষে সেটি বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪১৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি বেড়েছে এ ব্যাংকেরই এক হাজার ৮২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর জনতা ব্যাংকের ঘাটতি ১৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা হয় চলতি বছরের মার্চে। আর এবার সেটি দাঁড়ালো ২ হাজার ১৯৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ঘাটতি তিন মাসে বাড়ল ৭৫৫ কোটি টাকা।  
বরাবরের মতো এসব ব্যাংকের মধ্যে মূলধন ঘাটতির শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। মার্চ শেষে ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল সাত হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। সে হিসাবে বেড়েছে ৭৯ কোটি টাকা।
কার্যক্রম শুরুর মাত্র চার বছরের মাথায় সংকটে পড়া ফারমার্স ব্যাংক ৩০২ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়ে মার্চ শেষে। গত ডিসেম্বরে ঘাটতি ছিল ২৯০ কোটি টাকা। কিন্তু সরকারের উদ্যোগে ব্যাংকটিতে বড় অঙ্কের মূলধন জোগান দেওয়া হয়েছে। ফলে ঘাটতি থেকে বেরিয়ে এখন ৬১৯ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ খোলা কাগজকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো চলছে অনেকটা ফ্রি স্টাইলে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে যারা বোর্ডে আছেন, যারা ব্যবস্থাপনায় আছেন তাদের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে। এর জন্য সরকারকেও উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এটা সরকারের সরকারের দুর্বলতার ফসল। সরকারকে বলতে হবে যেসব মন্দ ঋণ আছে সেগুলো আদায় কর। যতটুকু আদায় করতে পারবে তার বেশি বিতরণ করতে পারবে না। যদি আদায় করতে না পার তাহলে ব্যাংকের কার্যক্রম সীমিত করব। এ ধরনের উদ্যোগ না নিলে ব্যাংকের কর্মকর্তারা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেবে না। ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার ফল এসে পড়ছে মূলধনে। এটা একটা রং সিগনাল। এটা ব্যাংকগুলোকে এ ধরনের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।’

 
.