কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই

জাফর আহমদ ১০:৩৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০১, ২০১৮

print
কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই

প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ব্যাংকগুলোর খাতা-কলমে ঋণ আছে; কিন্তু বাস্তবে নেই। বিদেশ গমনেচ্ছুকরা ঋণ পেতে গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখা ম্যানেজাররা নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেন। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলো জানায়, তারা এ ধরনের গ্রাহক পান না বলে ঋণ দেওয়া হয় না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে এমন চিত্র উঠে আসে।  

বিদেশি গমনেচ্ছুকদের খাতা-কলমে ঋণ দেয় দেশের ৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে পূবালী ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে বিদেশে গমনেচ্ছুক শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্র মালিকানাধীন বিশেষায়িত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ছাড়া বাকি ৬ ব্যাংকই ঋণ দেয় না।
এসব ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, প্রবাসী গমনেচ্ছুকদের ৯ শতাংশ হারে বিনা জামানতে ঋণ দেওয়া হয়। ঋণের পরিমাণ ১ লাখ টাকার ওপরে হলে সুদের হার হওয়ার কথা ১১ শতাংশ। দুই বছর মেয়াদে প্রবাসী আয় থেকে নির্দিষ্ট কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করা হয়।  বৈধ ভিসার বিপরীতে এ ঋণ দেওয়ার কথা।
বাংলাদেশ ব্যাংক এক অনুসন্ধানে জানতে পারে, ব্যাংকের প্রোডাক্ট (ঋণের ধরন) হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ ঋণ উল্লেখ থাকলেও আসলে কোনো ঋণ দেওয়া হয় না। এ বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শাখা ম্যানেজাররা ঝুঁকি নিতে চান না। কোনো গ্রাহক এলেও তারা নানা অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যান। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ধরনের ঋণ জামানতহীন নয়, এ ঋণ জামানতসহ চালু করতে হবে। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিদেশিগামী কর্মীদের জন্য প্রোডাক্ট থাকলেও ঋণ দেওয়া হয় না। ব্যাংকগুলোর অভিযোগ, তারা গ্রাহক পায় না।    
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খোলা কাগজকে বলেন, বিদেশগামী এ কর্মীদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। বিদেশে যাওয়ার জন্য ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায় তারা সম্ভবত জানেই না। কিছু লোক এলেও ঋণের শর্ত হিসাবে বৈধ ভিসা দেখাতে পারে না। এ কারণে বিদেশগামী কর্মীরা ব্যাংকমুখী হয় না। তিনি বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের ব্যাংক ঋণের সুবিধা দিতে হলে আগে প্রচার করতে হবে।
অন্যদিকে বিদেশ গমনেচ্ছুকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বৈধ ভিসার বিপরীতে ঋণ দিয়ে থাকে। ব্যাংকটি ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৫৮৪ জনকে ৭১ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ঋণ ফেরত আসার হারও সন্তোষজনক। বিতরণ করা ঋণের মধ্যে এ পর্যন্ত খেলাপির হার ৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে সরকার বিদেশ গমনেচ্ছুকদের জন্য ঋণ চালু করে। এ জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে। বিদেশমুখী মানুষকে বিদেশে যাওয়ার জন্য যাতে ভিটেমাটি বিক্রি করতে না হয় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধ অর্থ আসে সে উদ্দেশ্য থেকেও সরকার এ কার্যক্রম শুরু করে। ব্যাংকের ঋণ নিয়ে বিদেশে গেলে এসব মানুষের ভিটেমাটি রক্ষা হবে। প্রতারণা ও বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়া থেকেও রক্ষা পাবে। পাশাপাশি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় আসবে। এ উদ্দেশ্য থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিদেশ গমনেচ্ছুক শ্রমিকদের ঋণ দিতে প্রবাসী ঋণ চালু করতে নির্দেশ দেয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে এ ধরনের ঋণ চালু করতে নির্দেশ দেওয়া হয় সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে। কিন্তু এসব বাণিজ্যিক ব্যাংক নানা অজুহাত দেখিয়ে তা এড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের ধস নামে। আগের বছরগুলোতে প্রবাসী আয় বাড়লেও ওই বছরে কমে যায়। দেখা যায়, ২০১০-১১ প্রবাসী আয় আসে ৮২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন টাকা; ২০১১-১২ অর্থবছরে আসে ১,০১৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন টাকা; ২০১২-১৩ অর্থবছরে আসে ১,১৫৬ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন টাকা; ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১,১০৫ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন টাকা; ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১,১৮৯ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার; ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১,১৬৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন টাকা। এর পরের বছরেই প্রবাসী আয় নেমে আসে ১,০১০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন টাকা। এরপর ২০১৭-১৬ অর্থবছরে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার পর কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১,২৩১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেলেও তা আসলে ঝুঁকিমুক্ত নয়। রেমিট্যান্সের ক্রমবর্ধমান ধারা অব্যাহত রাখতে হলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স উৎসাহিত করা, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে হয়রানিমুক্তভাবে কর্মী পাঠানো এবং দালাল ও ফড়িয়াদের প্রভাব কমিয়ে আনতে হবে। সে লক্ষ্যেই বিদেশগামী কর্মীদের ঋণ দেয়-এমন ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে বসে বাংলাদেশ ব্যাংক। যাতে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা বিনিময় ও তাদের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে হতাশাজনক চিত্র উঠে আসে।