ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতি আবারও ভাঙছে

ঢাকা, শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১ | ২ মাঘ ১৪২৭

ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতি আবারও ভাঙছে

জাফর আহমদ ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০২০

print
ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতি আবারও ভাঙছে

দেশে আবারও মহামারী করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ এর ঢেউ লেগেছে। এতে রপ্তানি আয়, উৎপাদন, বিপণন, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে। আবারও আঘাত লেগেছে জীবন-জীবিকায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার প্রথম আভিঘাত সেরে ওঠার চেষ্টা চলছিল। কিছুটা উঠেও দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউ তা থামিয়ে দিল। এ অবস্থা প্রলম্বিত হলে করোনার আঘাতে খাদে পড়ে যাওয়া অর্থনীতির জেগে ওঠার যে চেষ্টা চলছিল, তা ব্যর্থ হয়ে যাবে। দ্বিতীয় ঢেউ সবার আগে তৈরি পোশাক শিল্পে লেগেছে। ইতিমধ্যে রপ্তানি কমে গেছে; কমে গেছে কার্যাদেশ। সামনে মৌসুমে এক-তৃতীয়াংশ ক্রয়াদেশ হারাবে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, আমেরিকা, ইউরোপে করোনার ঢেউ আছড়ে পড়ার কারণে রপ্তানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ঘরের বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। কমিয়ে দিয়েছেন কেনাকাটা। এ কারণে অনেক আউটলেট বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক আউটলেটে বিক্রি তলানিতে নেমেছে। যা অক্টোবর মাসেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কা লেগেছে। প্রথম ধাক্কায় তৈরি পোশাক শিল্প বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কারখানাগুলো আগের ছাঁটাই করা শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছিল। কিন্তু ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ লাগার কারণে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া আবার থমকে গেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেশের ছোট ছোট উদ্যোগে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ ইউরোপের বাজারে আগে লাগার কারণে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পেও আগে আঘাত লাগে।

কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে দেশে শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে। বাংলাদেশে করোনার অভিঘাত মূলত ঢাকা ও বড় বড় শহরকেন্দ্রিক। ঢাকায় শীত জেঁকে বসে নভেম্বরে। একই সময়ে করোনার আক্রান্তের হার বেড়েছে। অক্টোবরের শেষদিকে আক্রান্ত সর্বনিম্নে এলেও এ হার এখন আবার বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

গতকাল মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা গত তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গতকাল ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ২৮ জন। আর আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ১৮৩ জন। করোনাভাইরাসে মৃত্যু-আক্রান্ত বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীতে মানুষ ঘরের বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আয়-রোজগার ও ব্যবসা-বাণিজ্যে।

গতকাল রাজধানীর ফকিরাপুলের ছাপাখানায় মালিকদের চেহারায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ছাপ চোখে পড়ে। প্রেস মালিক মোশাররফ হোসেন বলেন, করোনার প্রথম থাক্কা সামাল দিয়ে উঠেছিলাম। পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন, বইপত্র ছাপা শুরু হয়েছিল। মনে করছিলাম করোনা গেল। কিন্তু গত কয়েক দিন আবার মানুষ কম আসা শুরু হয়েছে। এক মাস আগেও যে হারে গ্রাহক কাজ নিয়ে আসতেন, তা কমে অর্ধেকে নেমেছে। মনে হচ্ছে করোনা আক্রান্তের হার না কমলে গ্রাহক আসবেন না।

করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছোট্ট ও মাঝারি উৎপাদন, বিপণন ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। গুলিস্তান-পল্টনের ফুটপাতে যেসব হকার শীতের কাপড় বিক্রি করতেন, এবার তারাও থমকে গেছেন। আগের মতো বিক্রি শুরু করতে পারছেন না। নভেম্বর মাসের শুরুতেও যে বেচাবিক্রি হতো, তাও কমে গেছে। করোনার শুরু থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছোট্ট, মাঝারি ও কুটির শিল্প। এ খাতে যেমন উৎপাদন কমেছে। তেমনি ভোগ ও কর্মসংস্থান কমেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ডেউ লম্বা সময় ধরে চললে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। করোনার অভিঘাতে তলিয়ে যাওয়ার অবস্থা থেকে অর্থনীতি ওঠার যে চেষ্টা হচ্ছিল, সেখানে দ্বিতীয় ঢেউ আবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল বলে মনে করেন বিশ^ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, দেশের তৈরি পোশাকের বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপ-আমেরিকা খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। এ জন্য তারা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। এতে আমাদের প্রধান রপ্তানি খাতে আঘাত লেগেছে। আর বড় খাত আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় দেশের সব খাত আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। কোভিডের কারণে বিনিয়োগে যে আঘাত লেগেছিল, সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাও হচ্ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ে এ বিনিয়োগও উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারালো।

করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। যেখানে সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। এসব খাতে স্ব-কর্মসংস্থানও হয়ে থাকে। হোটেল, চায়ের দোকান, রিকশাওয়ালা- এ শ্রেণির মানুষ দ্বিতীয় ঢেউয়ে কর্ম হারানো শুরু করেছে। এ বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, করোনার অভিঘাত মোকাবিলায় সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, তা বড় ও মাঝারি শিল্প পেয়েছে। তারা ভালোও আছে। কিন্তু ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুঠির শিল্প এ সহায়তা আশানুরূপ পায়নি; বিভিন্ন জরিপে এটা উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সহায়তা না পাওয়ার যৌক্তিক কারণও রয়েছে।

ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে যে কাঠামো অনুসরণ করে এবং ছোট্ট ছোট্ট প্রতিষ্ঠানের যে কাঠামো রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে সহায়তা পৌঁছবে না। দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে এবার সার্ভে করে এসব প্রতিষ্ঠানকে এসএমই ফাউন্ডেশন-বিকেএসএফের মাধ্যমে এককালীন সহায়তা প্রদান করতে হবে।

করোনাভাইরাসের কারণে আগামী বছরের সামার হাতছাড়া হবে বলে মনে করেন নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, তৈরি পোশাশের বড় ক্রয়াদেশ আসে এই সামার থেকে। করোনার প্রথম ধাক্কা সামাল দিয়ে ওঠার পর আমরা আশা করেছিলাম হয়তো ওই ক্রয়াদেশগুলো ধরতে পারব। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ওয়েব শুরু হওয়ায় সেটা আর সম্ভব হবে না; ইতোমধ্যে ক্রেতারা জানিয়ে দিয়েছেন। ফলে দেশ প্রতি মাসে গড়ে এক বিলিয়ন করে ক্রয়াদেশ হারাবে। এই উদ্যোক্তা নেতা মনে করেন, ক্রয়াদেশ পেলে দেশে তৈরি পোশাক উৎপাদনের কোনো সমস্যা হবে না। করোনাভাইরাসের সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যেই উৎপাদন চালু রেখে আমরা সে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সক্ষমতা তৈরি করেছি। উৎপাদন অব্যাহত রাখার সে ব্যবস্থা আমাদের নেওয়া আছে।