রিজার্ভের ঋণ বিতরণ নিয়ে বিতর্ক

ঢাকা, বুধবার, ২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

রিজার্ভের ঋণ বিতরণ নিয়ে বিতর্ক

জাফর আহমদ ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২০

print
রিজার্ভের ঋণ বিতরণ নিয়ে বিতর্ক

নতুন উচ্চতায় বৈদেশি মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ। রিজার্ভ বৃদ্ধিতে যেমন দেশের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলাদেশে সক্ষমতা বেড়েছে, মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন সক্ষমতা ও মর্যাদার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিনিয়োগের দাবি উঠেছে। সেখান সরকার প্রধানও রিজার্ভ থেকে বিনিয়োগের চিন্তা করতে বলেছেন। কিন্তু সবার অজান্তেই রিজার্ভের বড় অংশ আগেই বিনিয়োগ হয়ে আছে। এ থেকে মুনাফা পাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকেই এমন তথ্য মিলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে বিনিয়োগের পরিমাণ ২৯ বিলিয়ন ডলার। ওই সময় দেশে মোট রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৮৫২ বিলিয়ন ডলার। যা মোট রিজার্ভের প্রায় ৮০ ভাগ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বিনিয়োগ হিসাবে দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসাবে দেওয়া হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের ঋণপত্রের বিপরীতে ইডিএফ বা এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট তহবিল হিসাবে।

৯ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। আর সরকারের গ্যারান্টির বিপরীতে দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমানসহ বিভিন্ন খাতে আরও প্রায় এক বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে স্থানীয় ঋণ ও বন্ড কেনা বাবদ। এ সব খাত থেকে সরকার সুদ হিসাবে বিপুল অঙ্কের টাকা পেয়ে থাকে। এর বাইরে ১৪ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রিজার্ভ ব্যাংকে বিভিন্ন মেয়াদে রাখা রয়েছে। সেখান থেকেও সুদ পায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের পরিমাণ ৩৯ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চায়নের পাশাপাশি বিনিয়োগও বেড়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার সাধারণ আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণের সুদ বা ঋণ ফেরত দিতে ব্যবহৃত হয়। বৈদেশিক ঋণ ও আমদানিতে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে বিদেশি এ সব প্রতিষ্ঠান দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ দেখে থাকে। কম রিজার্ভ থাকলে ঝুঁকি হিসাবে বিবেচনা করে থাকে। বেশি রিজার্ভ থাকলে বৈদেশিক ঋণ ও ঋণপত্র খুলতে সহজ হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশ একটি সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছে।

সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ রিজার্ভ থাকলেই হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে প্রায় আট মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এ রিজার্ভ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ঋণ হিসাবে দেওয়া যায় নাকি খতিয়ে দেখতে বলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে রিজার্ভ থেকে ঋণ দিলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইতিমধ্যে রপ্তানি কার্যক্রমে সুবিধা করার জন্য কম সুদে রপ্তানির কার্যাদেশের বিপরীতে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠন করে কম সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। রপ্তানির জন্য এলসি প্রাপ্তির পর এই তহবিল থেকে রপ্তানিকারকরা ঋণ সংগ্রহ করছে এবং পণ্য রপ্তানি করার রপ্তানিমূল্য পাওয়ার সঙ্গে এই টাকা ফেরত পাচ্ছে। এর বাইরে ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণ বিতরণ করলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যে হারে খেলাপি হয়েছে তা অর্থনৈতিক পুরো অর্জনকে মøান করে দিয়েছে। যদি রিজার্ভ থেকে ঋণ দেওয়া হয় এবং খেলাপি সংস্কৃতি এ ঋণকেও গ্রাস করে তাহলে বাংলাদেশে রিজার্ভের বিশ^াস যোগ্যতা হারাবে। বাইরে বাংলাদেশ সম্পর্কে খারাপ বার্তা যাবে।

ব্যক্তি উদ্যোক্তা পর্যায়ে ঋণ দিলে তা ঝুঁকি হতেই পারে। তবে রিজার্ভ থেকে অবকাঠামো খাতে ঋণ দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এই মনসুর।

তিনি বলেন, যেখানে অর্থনৈতিক, ফাইনান্সিয়াল, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সুবিধা আসতে পারে এমন অবকাঠামো খাতে পিপিপি-এর মাধ্যমে রিজার্ভ থেকে বিনিয়োগ করতে পারে। বিদেশি কোনো দক্ষ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ ছোট্ট অংশীদার হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারে, যেখানে রিজার্ভ বিনিয়োগ হবে।

তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থেকে এখন যে বিনিয়োগ হয়েছে তা কোথাও রাখতে হয় তাই রেখেছে। সেখান থেকে হয়তো কিছু ইন্টারেস্ট আসছে। প্রয়োজন ১০ বিলিয়নের একটি তহবিল গঠন করে এ ধরনের বিনিয়োগ করা যেতে পারে। ইডিএফ এর পাঁচ বিলিয়ন ডলারের তহবিল আছে সেটাও বৃদ্ধি করে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা যেতে পারে।