তাঁতশিল্পীদের সুবিধায় নতুন প্রকল্প

ঢাকা, রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

তাঁতশিল্পীদের সুবিধায় নতুন প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২০

print
তাঁতশিল্পীদের সুবিধায় নতুন প্রকল্প

দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পীদের জন্য আসছে সুখবর। তাদের হাতে তৈরি কারুকাজ উৎসাহিত করতে নেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ। জামদানি পণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং তাঁতশিল্পীদের বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিতে প্রদর্শনী কাম বিক্রয় কেন্দ্র ও বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের কথা ভাবছে সরকার। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবতে স্থাপন করা হবে বস্ত্র ও পাট জাদুঘর। নাম হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামে। সেখানে তাঁতিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং পরিবর্তিত বাজারে ভোক্তার চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন নতুন ডিজাইন উদ্বোধন এবং দক্ষ ডিজাইনার ও মানবসম্পদ তৈরিতে হবে একটি ফ্যাশন ডিজাইন ইনস্টিটিউট। এজন্য ‘বঙ্গবন্ধু বস্ত্র ও পাট জাদুঘর, জামদানি শিল্পের উন্নয়নে প্রদর্শনী কাম বিক্রয় কেন্দ্র, বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং একটি ফ্যাশন ডিজাইন ইনস্টিটিউট স্থাপন’ নামে একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। আগামী বছরের শুরুতেই আরম্ভ হবে কাজ, শেষ হবে ২০২৪ সালের জুনে।

জানা যায়, প্রস্তাবিত ‘বঙ্গবন্ধু বস্ত্র ও পাট জাদুঘর’ মুজিববর্ষে বাস্তবায়নের বিষয়ে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই অনুযায়ী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (পরিকল্পনা) আহ্বায়ক করে গঠিত নয় সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবতে একটি বঙ্গবন্ধু জাদুঘর স্থাপনের স্থান নির্ধারণ করে। তাঁত বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ ২০১৮ সালের তাঁত শুমারি অনুযায়ী আড়াইহাজারে ২০০টি, সোনারগাঁয়ে দুই হাজার ৭৯৯টি, রূপগঞ্জে তিন হাজার ১৮৫টিসহ সারা দেশে ১০ হাজার ৫৩টি জামদানি তাঁত বিদ্যমান। সেই হিসাবে প্রায় ৩১ হাজার লোক জামদানি শিল্পের সঙ্গে জড়িত।

আরও জানা গেছে, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের ধারক এ জামদানি শিল্পের উন্নয়নে ১৯৯২ সালে রূপগঞ্জের দক্ষিণ রূপসী গ্রামে জামদানি পল্লী প্রকল্পের কাজ হাতে নেয় সরকার। জামদানি শিল্প ও তাঁতিদের রক্ষা করাই ছিল এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনকে (বিসিক) প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে প্রকল্পের আওতায় ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে প্রতিটি এক হাজার ৫০০ বর্গফুট বিশিষ্ট ৪২০টি প্লট তাঁতিদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিটি প্লটের এককালীন মূল্য ধার্য করা হয় এক লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে এককালীন পরিশোধ করা হয় ৫৮ হাজার টাকা এবং বাকি ৭৫ হাজার টাকা ১০ বছরে পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়। জামদানি পল্লী প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৮ সালে প্রশাসনিক ভবন, বিপণন কেন্দ্র, হাট-বাজারের জন্য তিনটি সেড, পাম্প হাউস, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ সম্পন্ন করা হয় এবং প্লটগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়। বিসিক জামদানি তাঁতিদের ২০০০ সালে ৪০৭টি প্লট বরাদ্দ দেয়, কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি প্লট রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে।

জামদানি তাঁতিরা জানান, তারা বিসিকের কাছ থেকে প্লট ছাড়া কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। বিসিক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রকল্প ও নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় তারা জামদানি পল্লী নিয়ে চিন্তা করার সময় পান না। পানির লাইন, গ্যাস-বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট ইত্যাদি সমস্যার সমাধান তাঁতিদেরই করতে হয়। তারা জানান, বিসিক, নোয়াপাড়া জামদানি পল্লীর হাটে বৃষ্টির সময় পানি পড়ে, বাতাস ও বৃষ্টি হলে দোকান গুটিয়ে বসে থাকতে হয়। হাটে কোনো ওয়াশরুম, বিশ্রামাগার, ক্যান্টিন ইত্যাদির ব্যবস্থা নেই। ফলে মূল ক্রেতা নারীরা, মধ্যম ও উচ্চ শ্রেণির ক্রেতা এবং বিদেশি ক্রেতা এই হাটে কম আসেন। ক্রেতারা সরাসরি তাঁতিদের বাড়িতে গিয়ে তাঁতপণ্য কিনতে চান। কিন্তু জামদানি পল্লীর রাস্তাঘাট দীর্ঘদিন মেরামত করা হয় না। তাঁত বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, তাঁতিদের বাড়িঘর ও তাত শেড অস্বাস্থ্যকর, আশপাশে নোংরা পরিবেশ। অধিকাংশ তাঁতির বাড়িতে সেলস সেন্টার এবং মানসম্মত ওয়াশরুম নেই। এমনকি বসার ভালো ব্যবস্থাও নেই। ফলে জামদানি পল্লী প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই অর্জন হয়নি। জামদানি শিল্প হারাতে বসেছে তার গৌরবময় অতীত-ঐতিহ্য। এজন্যই নতুন প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে।

‘বঙ্গবন্ধু বস্ত্র ও পাট জাদুঘর’ প্রকল্পের উদ্দেশ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. শাহ আলম বলেন, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের বস্ত্র ও পাট খাতের গৌরবময় ইতিহাস ও সোনালী ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সাধারণ জনগণের কাছে তুলে ধরা। উৎপাদিত জামদানি পণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা। তাঁতশিল্পীদের জন্য বয়নপূর্ব ও বয়নোত্তর বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এ ছাড়া দেশের মধ্যম পর্যায়ের প্রযুক্তিবিদ তৈরি এবং তাঁতিদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান, পরিবর্তিত বাজারে ভোক্তার চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন নতুন ডিজাইন উদ্বোধন এবং দক্ষ ডিজাইনার ও মানবসম্পদ তৈরি করাও এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওকে ‘ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটি’র মর্যাদা লাভের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। জামদানিকে ঘিরে উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফট কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফট সিটি’র স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে প্রথম বাংলাদেশের কোনো স্থান ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটির মর্যাদা লাভ করে জানায় তাঁত বোর্ড। এছাড়া ২০১৩ সালে ইউনেস্কো জামদানি বয়নশিল্পকে ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক সামগ্রী হিসেবে স্বীকৃতি পায় জামদানি।