মুখ থুবড়ে পড়েছে বাজার ব্যবস্থা

ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

মুখ থুবড়ে পড়েছে বাজার ব্যবস্থা

শাহাদাত স্বপন ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২০

print
মুখ থুবড়ে পড়েছে বাজার ব্যবস্থা

ভোগ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে জোগান যেমন জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি উপযুক্ত বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। আর এ বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুরোপুরি সরকারের। যদিও এ কাজে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা জরুরি। বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারলে জোগান যত বেশিই হোক, পণ্যের দাম স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখা সম্ভব নয়। এর জ্বলন্ত প্রমাণ সম্প্রতি বাংলাদেশ ভোগ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি।

দেশে আলু-চালসহ বেশ কিছু পণ্যের পর্যাপ্ত জোগান থাকা সত্ত্বেও দামের ঊর্ধ্বগতি ঠেকানো যাচ্ছে না। চাল-এ উদ্বৃত্ত দেশ হিসেবে চলতি বছরের শুরুর দিকে চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। মাত্র তিন মাসের করোনা পরিস্থিতি ও বন্যার কারণে সেই দেশে চালের ঘাটতি জনিত কারণে প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে এটা অবিশ^াস্য মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনুরূপভাবে কৃষি তথ্য সার্ভিসের দেওয়া তথ্য মতে, যেখানে দেশের চাহিদার চেয়ে প্রায় ২৯ লাখ মেট্রিক টন আলু বেশি উৎপাদন হয়েছে। সেখানে আলুর দাম বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। ভোগ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির জন্য তারা বাজার ব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন। বাজার সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে। কোনো না কোনোভাবে প্রত্যেকটি পণ্যের দাম যেন বাড়ছেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এমন ঘটনা বিরল। সে সব দেশের সরকার ও ব্যবসায়ীরা যে কোনো মূল্যে উঠেছে। কোনো না কোনোভাবে প্রত্যেকটি পণ্যের দাম যেন বাড়ছেই। বিশে^র বিভিন্ন দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এমন ঘটনা বিরল। সে সব দেশের সরকার ও ব্যবসায়ীরা যে কোনো মূল্যে ভোগ্যপণ্যের দামের মূল্য স্বাভাবিক রাখতে সর্বদা তৎপর। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের তৎপরতা দৃশ্যত হলেও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের অভাবে সেসব তৎপরতা মাটি চাপা পড়ে। একদিকে দুর্বল বাজার মনিটরিং।

অপরদিকে ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক পরিচয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠার ঘটনা। এ দুই কারণে বাজারে অস্থিরতা থেকেই যায় সব সময়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন স্থল থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে প্রত্যেকটি স্তরে যথেষ্ট নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে। একদিকে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের চাঁদা দিতে হয়, অপরদিকে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফা অর্জনের প্রবণতা। এ দুইয়ে মিলে ভোগ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি সব সময় লেগেই থাকছে। এর মধ্যে আবার সুযোগ পেলেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ছোটখাট অজুহাতে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের তিন থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দেয় ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে সরকারের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি। রাষ্ট্রের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ছাড়া অন্য কোনো সংস্থা বা মন্ত্রণালয় তেমন কোনো ভূমিকা বাজার মনিটরিংয়ে রাখে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্ব যে ক’জন কর্মকর্তা পালন করেন তাদের নির্ধারিত দাফতরিক কাজও করতে হয়। এমনকি বাজার মনিটরিং শেষে তাদের দাফতরিক কাজ করতে মন্ত্রণালয়ে হাজিরা দিতে হয়। তাছাড়া বাজার মনিটরিংয়ের জন্য দাফতরিক কোনো সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম সরকারের পক্ষ থেকে পরিচালনা করা হয় না। যখনই বাজারে কোনো নৈরাজ্য তৈরি হয় শুধু তখন তদারকির চেষ্টা করা হয়। এর ফলে বুঝে উঠতে উঠতে জনগণকে অধিক দামে পণ্য ক্রয়ে মাশুল দিতে হয়।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, জোগান পর্যাপ্ত থাকার পরও ভোগ্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির প্রশ্নই ওঠে না বরং মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ঘাটতি পর্যালোচনা করে জোগান পর্যাপ্ত করতে কর্তৃপক্ষ আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করলে বাজারে ভোগ্যপণ্যের দামের বৃদ্ধির সুযোগ নেই। মুক্তবাজার অর্থনীতি কথা বলে বাজার ব্যবস্থাপনা না করে সব কিছু ব্যবসায়ীদের ওপর ছেড়ে দেওয়াটাও নির্বুদ্ধিতা। এক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারকে শুধু রেফারির ভূমিকা পালন করলেই চলবে না বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয় পার্টিসিপেন্টের ভূমিকা রাখতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির বিষয়টি সঠিক। কিন্তু বাজার যদি ফেল করে তখন সরকারকে ইন্টারভেন করতে হবে। সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে, সেই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে এটি নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কমিটি করে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হয় হবে।

এদিকে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির মৌলিক দুটি কারণ, একটি হচ্ছে পর্যাপ্ত জোগানের অভাব, অপরটি সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা। পেঁয়াজসহ যে কয়টি ভোগ্যপণ্য আমদানি করতে হয় এসব পণ্যের রপ্তানি বন্ধ হলে বাংলাদেশের বাজারে দামে বড় প্রভাব পড়ে। কিন্তু যেসব পণ্য আমদানি ছাড়াই দেশীয় উৎপাদন দিয়ে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব এসব ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। এখানে বাজার ব্যবস্থাপনা চরমভাবে দায়ী বলেও মত দেন তারা। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে ভোগ্যপণ্যের উৎপাদনকারীর কাছ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে যেসব মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা কাজ করেন তাদের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করা হলেও সরকারের নির্দেশনা অনেক ক্ষেত্রেই তারা উপেক্ষা করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব ব্যবসায়ী সরকারকে অনেক ক্ষেত্রেই ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব প্রদর্শন করে। এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের প্রতি তারা আক্ষেপ করে বলেন, মন্ত্রী হিসেবে দাম নির্ধারণ করে দিয়ে তারা বেঁচে যান। ব্যবসায়ীদের জন্য যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত সেদিকে তাদের খেয়াল নেই। এদিকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের সভায় ব্যবসায়ীদের নানা আক্ষেপ প্রকাশ করতেও দেখা যায়। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়িক অংশীদার এবং পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্র। উভয় দেশের বাণিজ্য দিন দিন বাড়ছে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো দূর করে ভারতের সঙ্গে ব্যবসা বাড়ানো হবে। ভারত পণ্যের একটি বড় বাজার, বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির প্রচুর সুযোগও সেখানে রয়েছে। আমরা এ সুযোগ কাজে লাগাতে চাই। বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত এলাকায় স্থাপিত বর্ডার হাটগুলোতে উভয় দেশের মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। আরও তিনটি বর্ডার হাট উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে।

তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চলমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে এগুলো সমাধান করা হবে। এমনকি আলোচনা করে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি ভারতে কীভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে কাজ করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ শুধু ভারতে ১ হাজার ৯৬.৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। তাছাড়া করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশকে বড় বাণিজ্য সুবিধা দিয়েছে চীন। বাংলাদেশের আট হাজার ২৫৬টি পণ্য শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে চীনে। যা দেশটিতে রপ্তানি পণ্যের ৯৭ শতাংশ।