কৃষকই ব্যাংকসেরা গ্রাহক

ঢাকা, শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

কৃষকই ব্যাংকসেরা গ্রাহক

জাফর আহমদ ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২০

print
কৃষকই ব্যাংকসেরা গ্রাহক

করোনা মহামারীর মধ্যে সুখবর দিয়েছে সাধারণ কৃষিঋণ। সুখবর এসেছে কৃষিঋণ বিতরণ, ফেরত এবং খেলাপিতেও। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। অন্যান্য ঋণের কিস্তি যেখানে বন্ধ; সেখানে কৃষিঋণ বিতরণ ও ফেরত দেওয়া অব্যাহত থাকায় কৃষির জন্য সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও যারা ঋণ ফেরত দিচ্ছেন তাদের ইনসেনটিভ দিয়ে উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান।

করোনাকালে ৪ শতাংশ হারে প্রণোদনার কৃষিঋণ বাইরেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মোট বিতরণ করা ঋণের ২ শতাংশ কৃষি হিসেবে বিতরণ করে। সে হিসেবে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ২৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে বিতরণ করা হয়েছে চার হাজার ৬৮৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ১৭ দশমিক ৮২ শতাংশ। গত বছরে একই সময়ে বিতরণ করা হয়েছিল লক্ষ্যমাত্রার ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারীর মধ্যে গত বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি বিতরণ হয়েছে। টাকার অংকে যা এক হাজার ১২৯ কোটি ৬৬ লাখ বেশি বিতরণ করা হয়েছে।

করোনার সময়ে কৃষি ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি কাজ শেষে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান।

তিনি বলেন, এটা একটি ভালো লক্ষণ, তারা ভালো গ্রাহক, তাই প্রমাণ করে। তাদের টাকা দিতে ভয় পাওয়া উচিত নয়। তারা টাকা নিলে ফেরত দেন- এ সংস্কৃতিটা অন্তত আছে। ঋণ নিয়ে যারা দিচ্ছেন আর পারব না বলে ঋণ ফেরত দিচ্ছেন না- তাদের মধ্যে একটা পার্থক্য থাকা প্রয়োজন। যে কৃষক টাকা ফেরত দিচ্ছেন তাদের প্রণোদনা দেওয়া উচিত। এটা অন্য ঋণের ক্ষেত্রেও করা উচিত। কৃষিঋণ বিতরণের পাশাপাশি আদায়েও সুখবর এসেছে।

চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে আদায় হয়েছে ছয় হাজার ২৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা মোট ঋণ স্থিতির (আউটস্ট্যান্ডিং) ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। আগের বছরের স্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে আদায় হয়েছিল ১০ দশমিক ৩৬ শতাংশ বা চার কোটি ৩৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। করোনার মধ্যেও কৃষি সচল থাকার কারণে কৃষক কৃষিঋণ ফেরত দিতে পেরেছে বলে মনে করছেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা।

সরকার কৃষি সচল রাখার জন্য বীজ, সার ও অন্যান্য ইনপুট সরবারহ রেখেছে। এজন্য প্রণোদনাও বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, সরকারে উদ্যোগের ফলে কৃষি কর্মচঞ্চল ছিল। পল্লী অঞ্চলে করোনা তেমন আঘাত না করায় কৃষি সচল ছিল। গবাদি পশু খামার ও অর্থকরী ফসল করোনা মহামারীর শুরুর দিকে কিছুটা ক্ষতি করলেও দ্রুত ঠিক হয়ে যায়।

কৃষিপণ্য বিশেষ করে পচনশীল ফল-ফলাদি বিক্রির জন্য শহরের বিশেষ বিশেষ জায়গায় প্রদর্শনী ও অনলাইনে বিক্রির জন্য প্রচারের কার্যক্রমের ফলে কৃষি পণ্য বিক্রিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। এতে মহামারী মোকাবিলায় ভূমিকা রাখে। কৃষকের নগদ টাকার সমস্যা কেটে যায়। এর ইতিবাচক প্রভাব পাওয়া যায় চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের কৃষি বিতরণ ও আদায়ে।

ঋণ খেলাপির ক্ষেত্রেও স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি। আগের বছর প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১১ দশমিক ১০ শতাংশ। এ বছর একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ। করোনা মহামারী বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিকে আঘাত করেছে খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে সে রকম নেতিবাচক আঘাত করতে পারেনি।

করোনাকালে শিল্প, ট্রেডিং, চলতি মূলধনসহ অন্যান্য সব ঋণের কিস্তি ও সুদের কিস্তি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ ছিল। ডিসেম্বর পর্যন্ত ওই সব গ্রাহক ঋণের টাকা ফেরত না দিলেও খেলাপি হবেন না। এ সুযোগে বড় বড় ব্যবসায়ী ঋণের কিস্তি ফেরত দেননি। দেননি সুদের টাকাও। আগামী দুই মাসও অনেক শিল্পপতি- বড় বড় ব্যবসায়ী ফেরত দেবেন না। কিন্তু কৃষকের ক্ষেত্রে উল্টো ঘটনা ঘটেছে। আগের মতোই তারা ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি ঋণ ফেরতও দিয়েছে। কৃষক যেখানে করোনা মোকাবিলা করে ঋণের কিস্তি ফেরত দিচ্ছে।

আবার ঋণ নিচ্ছে। কৃষকই সেরা গ্রাহকে পরিণত হয়েছে। সেই কৃষককে প্রথম প্রান্তিকে ঋণ না দিয়ে অকৃতজ্ঞের খাতায় নাম লিখিয়েছে দেশি-বিদেশি ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংক। এ ব্যাংকগুলো হলো- বিদেশি সিটি ব্যাংক এনএ, এইচএসবিসি ব্যাংক ও উরি ব্যাংক, দেশি বাণিজ্যিক কমার্শিয়াল ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক এবং সীমান্ত ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংক তার মোট বিতরণকৃত ঋণের ২ ভাগ কৃষকের মাঝে বিতরণ করতে হবে এবং সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সুদ নিতে পারবে। কিন্তু এসব ব্যাংক কৃষককে ঋণ দেওয়া শুরুই করেনি।