যশোরে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া

ঢাকা, শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

যশোরে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া

বি এম ফারুক ৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২০

print
যশোরে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া

দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া ছুটছে তো ছুটছেই। লাগাম পরানো যাচ্ছে না। এর পায়ে পিষ্ট হচ্ছে জনজীবন। ব্যয় বাড়ার কারণে অন্যান্য চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের। চাল, আলু, সবজি, তেল- সবকিছুর দামই আকাশছোঁয়া। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানানো হচ্ছে বারবারই। বাজারে গেলে থরে থরে সাজানো দেখা যাচ্ছে সব পণ্য। কিন্তু কিনতে গেলে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে ক্রেতাদের। এদিকে আলু-চালের দাম বেঁধে দেওয়ার পরও কমছে না দাম। প্রশাসনের দেখভালের অভাবকেই দায়ী করছেন ক্রেতারা। 

অন্যদিকে দেড় ডজন ডিমের দামে মিলছে এক কেজি ব্রয়লার মুরগি। তবে বরাবরের মতো চড়া রয়েছে দেশি মুরগি, গরু ও খাসির মাংসের দামও। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর দাবি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যশোর শহরের বিভিন্ন বাজারে সরেজমিন গেলে বাজারের আগুন-চিত্র দেখা যায়। ৩০ টাকার ওপরে আলু বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পাইকারি ও খুচরা বাজারভিত্তিক বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশিতে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সরু ও মাঝারি চালের দামে সরকার লাগাম টানলেও যশোরের খুচরা বাজারে প্রভাব পড়েনি। প্রতি কেজি ভালো মানের মোটা চালের দাম ৪০-৪৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকা এবং সরু চাল ৫৮ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বড় বাজারে কথা হয় সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা পড়েছি মহাবিপাকে। যারা কারও কাছে যেতে পারি না। অভাবের কথা বলতে পারি না। এর আগে করোনার প্রকোপে ঘরবন্দি থেকে প্রায় সবই শেষ। এখন বাজারের আগুন পুড়িয়ে মারছে। একই বাজারে দ্রব্যাদি কিনতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তা মুকুল হোসেন বলেন, অনেক পরিবারে বাবা-মা ও ছেলেমেয়েসহ কমপক্ষে ছয়-সাতটি পেট। তাহলে সারা দিনে দাঁড়ায় ১৮ থেকে ২১টি প্লেট। চালের টাকা জোগাড় করতেই তো জান শেষ! তার ওপর কাঁচাবাজারে তো এখন ঢোকাই যায় না। চুয়াডাঙ্গা বাজারে দিনমজুর আব্দুল মালেক বলেন, ‘অবস্থা এমন থাকলে ক’দিন পর না খেয়ে থাকা লাগবে।’ বাসাবাড়িতে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতেন জাহানারা বেগম। কিন্তু এখন তেমন একটা বিক্রি-বাট্টা নেই। জীবিকার জন্য বিকল্প উপায় খুঁজছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘৫০-৭০ টাকার নিচে তো কোনো সবজিই নেই। শাকের দামও বাড়ছে।’

ক্রেতারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়াচ্ছেন। সরকারকে কঠোর হাতে অতি লোভী অসাধু এসব ব্যবসায়ীকে দমন করতে হবে। বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যতালিকা টাঙানো এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে কি-না, সেটি পর্যবেক্ষণের জন্য সব বাজারে মনিটরিং কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃষকের কাছ থেকে সবজি কেনার পর খরচ-খরচা বাদ দিয়ে সামান্য মুনাফায় যৌক্তিক মূল্যে আড়ত থেকে সবজি বিক্রি হওয়ার কথা। আর খুচরা বিক্রেতা খরচ-খরচাসহ সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫% বাড়তি যৌক্তিক মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল রশিদ সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষি বিপণন আইনে সেই নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। এই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাজারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে এমনটিই মতো সংশ্লিষ্টদের।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, যশোরের আট উপজেলায় ৪ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হচ্ছে। এসব জমিতে কৃষকরা বেগুন, পটোল, শিম, টমেটো, লাউ, মূলা, বাঁধাকপি, ঢেড়শ, বরবটি, সবুজশাকসহ বিভিন্ন সবজি আবাদ করেছেন। জেলার কৃষকরা মৌসুমে সাধারণত দুইবার সবজির আবাদ করে থাকেন। তবে এবার অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে খেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক সবজি দুই থেকে তিনবার চাষ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে যশোরের ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষের অফিস বলছে, অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে ভোক্তাদের সচেতনতা দরকার। সচেতনতা বাড়াতে বছরের পর বছর আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। তবে ভোক্তারা বলছেন, জেলা প্রশাসক ও ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষের তেমন নড়াচড়া দেখতে পাচ্ছেন না তারা।