খাদ্যপণ্যে সিন্ডিকেট ওপেন সিক্রেট

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

খাদ্যপণ্যে সিন্ডিকেট ওপেন সিক্রেট

শাহাদাত স্বপন ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২০

print
খাদ্যপণ্যে সিন্ডিকেট ওপেন সিক্রেট

সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ক্রয়-বিক্রয়। সরকার চালসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিলেও তা মানছেন না ব্যবসায়ীরা। যে কোনো পণ্য কৃষক উৎপাদন করে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করেন মিল মালিক, পাইকার বা সংরক্ষণকারীদের কাছে। ফলে উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে ভোগ্যপণ্য চলে যায় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে। পরে তা সুবিধামতো সময়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন তারা। একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে এ ভোগ্যপণ্যের ক্রয়-বিক্রয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লেনদেন সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। দু-চারটি পণ্য ছাড়া প্রত্যেকটি পণ্যের দাম কমবেশি সব সময় বেড়েছে। যে পণ্যের দাম একবার বাড়ে তা আর কমে না।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ৭ গুণ পর্যন্ত। ২০১০ সালে প্রতি কেজি আলুর গড় মূল্য ছিল ১০ টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ টাকায়। একই সময়ে পেঁয়াজের দাম ছিল ১০ থেকে ১৫ টাকা কেজি, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১০০ টাকার উপরে। ঠুনকো কারণে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ঘটনা ঘটছে। চাল, আলু, পেঁয়াজ, আদা-রসুন, কাঁচামরিচ ও বিভিন্ন পদের কাঁচা বাজারের বর্তমান মূল্য বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে চড়া। ভোগ্যপণ্যের এমন মূল্যবৃদ্ধির সঠিক ব্যাখ্যা নেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছেও। তারা বলছেন, পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। আমাদের বাজারগুলোতে অভিযানও চলমান রয়েছে। এরপর মূল্যবৃদ্ধি কেন? এ প্রশ্ন আমাদেরও। দফায় দফায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী ও সচিবরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এমনকি চাল ও পেঁয়াজের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও তা মানছেন না ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির যেসব ঠুনকো কারণ বলা হচ্ছে, তাও যুক্তিযুক্ত নয় বলে মনে করছেন ক্রেতারা। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর করোনা ও বন্যার কারণে ত্রাণ হিসেবে আলুর বিতরণ বেশি হয়েছে। এ কারণে আলুর দাম বেড়েছে। তবে ক্রেতাদের দাবি, যে পরিমাণ আলু বিতরণ করা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে সেই পরিমাণ আলু তো মানুষ এমনিতেই ক্রয় করত। তাহলে সংকট হবে কেন? এদিকে আড়তদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, হিমাগারগুলোতে আলুর পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তাদেরও প্রশ্ন বিগত যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে একই পরিমাণ মজুদ রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাজারে কেন আলুর দাম বাড়ছে?

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, চলতি বছর ১ লাখ মেট্রিক টন আলুর উৎপাদন বেশি হয়েছে। দেশের চাহিদার চেয়ে প্রায় ২৯ লাখ মেট্রিক টন বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে। ফলে ঘাটতির কারণে আলুর দাম বৃদ্ধির সুযোগ নেই। এ ছাড়া অন্যান্য সবজির কারণে আলুর দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। কৃষকের উৎপাদিত আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করে কৃত্রিম সংকট দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। যে আলু বর্তমানে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে, সেই আলুর ক্রয়মূল্য ছিল অনেক কম। ফলে বেশি দামে আলু বিক্রির কোনো কারণ নেই। এখানে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ আলুর প্রয়োজন হয়, তার অনেক বেশি উৎপাদিত হয়। কিছু আলু ত্রাণ হিসেবে বিতরণের ফলে সামান্য সংকট তৈরি হতে পারে। তাই বলে তিনগুণ মূল্যবৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। নিয়মিতভাবে আমরা বাজার মনিটরিং করছি। প্রতিদিনই স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বাজারগুলোতে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে সংরক্ষণাগারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

একইভাবে চালের দাম বৃদ্ধির ঘটনায় ব্যবসায়ীদের দুষছে মন্ত্রণালয়। খাদ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে চালের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও সঠিক মূল্যে চাল বিক্রি করছেন না পাইকার ও মিল মালিকরা। মিল মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ীরা একে অপরকে দুষছেন। পেঁয়াজের দামের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনাই ঘটছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথভাবে বাজার মনিটরিং না করলে এবারও ২০০ টাকায় পেঁয়াজ কিনতে হতো। শুধু মনিটরিং করলেই ভোগ্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে; নচেৎ নয়, এমন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের অসৎ প্রবণতার কারণেই এটা হয়।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পেঁয়াজ গ্রীষ্মকালেও কীভাবে উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মেটানো যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পেঁয়াজের বীজ উপকরণ ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। গ্রীষ্মকালীন দেশের কোন কোন উপজেলায় কতজন কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারবেন, তাদের তালিকা প্রণয়নে নির্দেশনা দিয়েছি। দেশীয়ভাবে পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়াতে পারলে আগামীতে এ ধরনের সংকট থাকবে না।

পর্যাপ্ত বাজার মনিটরিংয়ের ঘাটতি হচ্ছে কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, অভিযান পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো জনবল নেই। যারা অভিযান পরিচালনা করেন, তারাই দিন শেষে সচিবালয়ে অফিসে এসে অফিস করেন। এ ছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ঢাকায় কিছু অভিযান পরিচালনা করে। জনবল সংকটে আমরা সব জায়গায় অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। বাজার মনিটরিংয়ের জন্য অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আলাদা জনবল দিতে পারলে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট পর্যায়ক্রমে ভাঙা যাবে বলেও মত দেন এসব কর্মকর্তা।

এদিকে খাদ্য অধিদফতর বলছে, কৃষক ধান উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে মিল মালিকদের কাছে হস্তান্তর করে। আর্থিক সংকট থাকায় কৃষক কমমূল্যে অধিকাংশ ধান মিল মালিকদের কাছে দিয়ে দেয়। মিল মালিকরা সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে চালের দাম বাড়ায়। বাংলাদেশ কিছুদিন আগেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন হওয়ায় রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই দেশে চালের ঘাটতির কোনো সুযোগ নেই। এ ঘাটতি কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়েছে। খাদ্য অধিদফতরের পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, জনপ্রতি মাথাপিছু যে পরিমাণ চালের প্রয়োজন, তার চেয়ে অধিক চাল বাংলাদেশে রয়েছে। চালের ঘাটতির কোনো সুযোগ নেই। তারা আমাদের নানা অজুহাত দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে করেই চালের দাম বৃদ্ধি করেছেন।