পেয়ারা-জাম্বুরার পর্যাপ্ত জোগান, মূল্য বেশি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

পেয়ারা-জাম্বুরার পর্যাপ্ত জোগান, মূল্য বেশি

শাহাদাত স্বপন ১:৩৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২০

print
পেয়ারা-জাম্বুরার পর্যাপ্ত জোগান, মূল্য বেশি

পেয়ারা ও জাম্বুরার পুষ্টিগুণ নিয়ে নেই কোনো প্রশ্ন। বাজারে বিষমুক্ত খাবারের ক্ষেত্রেও এ দুটি ফলের ওপর মানুষের আস্থা কয়েকগুণ। মানুষ মনে করে এসব ফলে বিষ প্রয়োগের সুযোগ নেই বললেই চলে। এ কারণে প্রায় প্রতিদিনই মানুষ পেয়ারা ও জাম্বুরা কেনে। একদিকে জাম্বুরা ও পেয়ারার পুষ্টিগুণ; অপরদিকে বিষমুক্ত পাওয়ার সম্ভাবনা- ফলে এ দুটি ফল ক্রয়ে মানুষের মধ্যে তুলনামূলক ঝোঁক বেশি। কিন্তু খুচরা বাজারে বিগত ১০ বছরে এ দুটি ফলের তুলনামূলক দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। একদিকে জোগান বাড়ছে অপরদিকে দামও বেড়েছে হু হু করে। অর্থনীতির ভাষায় জোগান বাড়লে দাম কমে। কিন্তু এ দুটি ফলের ক্ষেত্রে গেল ১০ বছরের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে তার উল্টো চিত্র। তবে চিত্র যাই হোক, ফল দুটির জোগান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, জোগান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মূল্য না কমে বরং তা বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, যে হারে খুচরা বাজারে ফল দুটির দাম বেড়েছে, সেই হারে দাম পাচ্ছে না কৃষকপর্যায়ের বিক্রেতারা।

রাজধানীর কারওয়ানবাজার, শ্যামবাজার, বেড়িবাঁধ, যাত্রাবাড়ী ও মিরপুর শাহআলী পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, যে পেয়ারা পাইকারি প্রতি কেজি ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। যে পেয়ারা পাইকারি বাজারে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তা খুচরা বাজারে ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে। এসব পেয়ারা প্রথমে কৃষক বিক্রি করছেন স্থানীয় আড়তদারদের কাছে, তারা তা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। আর পাইকারি ব্যবসায়ীরা রাজধানীর বিভিন্ন আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন। আর তাদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা কিনে তা পৌঁছে দিচ্ছেন ভোক্তার কাছে। ফলে যে পেয়ারা বাগান মালিক অর্থাৎ কৃষক ৩০ টাকায় বিক্রি করেন তা ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি। এর থেকে আরেকটু উন্নত মানের পেয়ারা প্রতি কেজি ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়।

প্রশ্ন করা হলে কারওয়ানবাজারের আড়তদার মো. মকবুল হোসেন বলেন, কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে প্রায় ৫ থেকে ৬ ধাপে এ পেয়ারা হাতবদল হয়। বহন খরচ, রাস্তার খরচ ও লেবার খরচ মিলিয়ে কৃষকের কাছ থেকে ৩০ টাকায় ক্রয় করা প্রতি কেজি পেয়ারা আমাদেরকে বিক্রি করতে হয় ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত। যা পরবর্তীতে খুচরা বিক্রেতারা ভোক্তার কাছে প্রতি কেজি বিক্রি করেন ৭০ থেকে ৮০ টাকায়।

খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজিতে অধিক মূল্যে বিক্রির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তারা পরিমাণে কম বিক্রি করে। এভাব কেজিতে কৃষকের বিক্রয় মূল থেকে প্রায় দ্বিগুণ দাম বেশি দিয়ে সাধারণ ভোক্তারা এসব পণ্য ক্রয় করে। এদিকে খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতিটি জাম্বুরা ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ানবাজার ও শ্যামবাজারের জাম্বুরার পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, ভালো মানের পাইকারি প্রতিটি জাম্বুরা বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। যা খুচরা বাজারে ভোক্তাদের ক্রয় করতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাম্বুরার জোগান বিগত বছরগুলোর চেয়ে এ বছর কয়েকগুণ বেশি।

কারওয়ানবাজারে জাম্বুরার আড়তদার মো. আবু তাহের শেখ জানান, আমাদের এখানে যেসব জাম্বুরা পাওয়া যায় তা ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও জয়পুরহাটসহ বেশ কিছু এলাকা থেকে আসে। কুমিল্লার নিমসার বাজার জাম্বুরার বড় উৎস। আপনি রাত ২টার পর এসে সকাল ৬টা পর্যন্ত এখানে দেখবেন জাম্বুরার এত সরবরাহ যে কারওয়ানবাজারের জাম্বুরার আড়তে এক ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা নেই। বিগত যে কোনো সময়ের তুলনায় এ বছর জাম্বুরার জোগান অনেক বেশি। তবে গেল কয়দিন আগের তুলনায় বর্তমানে জাম্বুরার পাইকারি বাজার তুলনামূলক কম। কিন্তু খুচরা বাজারে আমরা দেখি জাম্বুরার দাম ততটা কমেনি।

এখানে সমস্যা হচ্ছে খুচরা বিক্রেতারা হাতেগোনা ৭০ থেকে ১০০টি জাম্বুরা বিক্রি করে। এতেই তাদের দিনের খরচ বাবদ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা ইনকাম করতে হয়। ফলে তারা প্রতি পিস জাম্বুরার ওপর ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত আয় করে। এজন্য কৃষকের বিক্রয় মূল্য ও ভোক্তা মূল্যের মধ্যে বড় অংকের তফাৎ দেখা যায়। ফলে বাধ্য হয়েই নানাগুণে সমৃদ্ধ এ ফল বেশি দামে ক্রয় করতে বাধ্য হয় মানুষ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদনস্থলের সঙ্গে ভোক্তাপর্যায়ে এসব ফলের মূল্যের পার্থক্য কমাতে সরকারের খুচরা বাজার মনিটরিং প্রয়োজন। তাছাড়া রাস্তায় বিভিন্ন যানবাহন থেকে চাঁদা ও হয়রানি বন্ধ হলে আরও কমমূল্যে ভোক্তা পর্যন্ত এসব ফল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

এ বিষয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকার কারওয়ানবাজারে পাইকারি আড়তদারদের সরবরাহকারী ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ বছর কৃষকের কাছে প্রচুর জাম্বুরা আছে। কৃষক থেকে কারওয়ানবাজার পর্যন্ত পৌঁছতে যানবাহনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের খরচ বহন করে সেখান থেকে অর্থ আয় আমাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষকদের উপযুক্ত দাম দেওয়া কঠিন। পাইকারি বাজারে আমরা বিক্রয় করতে গেলে তেমন দাম পাই না। অথচ আমাদের কাছে অভিযোগ আসে এসব পণ্য খুচরা বাজারে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, এ ধরনের পণ্য বিশেষ করে পেয়ারা ও জাম্বুরা ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় খুচরা বিক্রেতারা বিক্রি করে। কে কোথায় কত দামে বিক্রি করছে সেটা ধরাও মুশকিল। তাছাড়া যেসব খুচরা বাজারে আমরা অভিযানে যাই সেখানে এমন অসঙ্গতি সাধারণত কম পাওয়া যায়। তবে আমাদের অভিযানগুলো নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। মাঠ প্রশাসনকেও বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বড় কোনো অসঙ্গতি পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।