সুযোগে বেপরোয়া বাণিজ্য

ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০ | ১১ কার্তিক ১৪২৭

সুযোগে বেপরোয়া বাণিজ্য

শাহাদাত স্বপন ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০

print
সুযোগে বেপরোয়া বাণিজ্য

বাজারে অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। নির্দিষ্ট কয়েকটি ছাড়া প্রতিটি পণ্য কিনতে হচ্ছে চড়া মূল্যে। এখনো খুচরা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়, আদা বিক্রি হচ্ছে আড়াইশ’ টাকায়, সব ধরনের চালে ৫ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও রসুন, ভোজ্য তেল, প্যাকেটজাত খাদ্যসামগ্রী ও চিনির মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। তবে আটা ও ময়দার দাম কিছুটা স্থিতিশীল পর্যায়ে। যদিও কয়েকদিন আগে তা কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, খুচরা ব্যবসায়ীরা দুষছেন পাইকারি ব্যবসায়ীদের আর পাইকারি ব্যবসায়ীরা দুষছেন আমদানিকারকদের। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে পণ্যের মূল্য সামান্য বাড়তেই খুচরা ব্যবসায়ীরা তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমদানিতে যা বৃদ্ধি পায়, প্রান্তিক পর্যায়ে গিয়ে তা তিন থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত বাড়ে।

অপরদিকে আমদানিকারকদের অভিযোগ- দেশীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বিদেশ থেকে ভোগ্যপণ্য আমদানি করতে করোনা পরবর্তী সময়ে নানা অজুহাত শুনতে হচ্ছে রপ্তানিকারকদের। তাছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানিরও শিকার হতে হচ্ছে তাদের। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য এলসি করার পর সমপরিমাণ পণ্য না দিয়ে পরিমাণে কম দিচ্ছে।

ফলে পণ্যের প্রতি কেজিতে বেশি দাম পড়ে যাচ্ছে। তবে তাদের দাবি, কেজিতে যে পরিমাণ দাম বৃদ্ধি পায়, ওই পণ্য খুচরা বাজার পর্যন্ত যেতে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রান্তিক পর্যায়ের বিক্রেতাদের দায়ী করছে এসব আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ী।

রাজধানীর শ্যামবাজারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হাফিজ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. হাফিজুর রহমান খোলা কাগজকে বলেন, পাইকারি বাজারে বর্তমানে আমরা ৭০ থেকে ৭২ টাকায় দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করছি। বলতে গেলে পেঁয়াজ বিক্রি খুবই কম। ফলে খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ১০০ টাকা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। খুচরা ব্যবসায়ীরা এটা কেন করছে- বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিতদের তা খতিয়ে দেখা উচিত।

খুচরা ব্যবসায়ীরা কত টাকায় পাইকারি ক্রয় করে আর কত টাকা বিক্রি করছে- তাদের মেমো দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লে শুধু পাইকারি বিক্রেতাদের ওপর দোষ চাপানো উচিত নয়। তিনি বলেন, বর্তমানে ভারতে পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ রুপিতে। যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। ভারতের পেঁয়াজ আমদানি চালু থাকলে বরং বাংলাদেশে দাম আরও বৃদ্ধি পেত। ভারতের পেঁয়াজ বন্ধ থাকায় আমরা কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারছি। তবে ভোক্তা পর্যায়ে সঠিক দামে ভোগ্যপণ্য পেতে সরকারের খুচরা বাজার মনিটরিং জোরদারের দিকে নজর দেওয়া উচিত বলেও মত দেন এ ব্যবসায়ী।

এক্ষেত্রে খুচরা বাজার মনিটরিংয়ে দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থা বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার অধিদফতর ও স্থানীয় প্রশাসনসহ যারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন, তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ ক্রেতারা। তারা বলছেন, শক্তভাবে বাজার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অব্যাহত থাকলে পাইকারি ব্যবসায়ী অথবা খুচরা ব্যবসায়ী যেই হোক না কেন ভোগ্যপণ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তারা এমন কারসাজি করতে পারত না। তাদের দাবি, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কথা নয়। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বারবার বলা হয়েছে, যেই মুহূর্তে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয় সেই মুহূর্তে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৩ মাস চলার মতো পর্যাপ্ত পেঁয়াজ সংরক্ষিত থাকে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ভারতের পেঁয়াজের ওপর আমরা শতভাগ নির্ভরশীল নই। দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা পেঁয়াজ আমদানি করি। সে ক্ষেত্রে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ভারত থেকে আমদানি বন্ধ হলে বরাবরই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এটা করে থাকেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি নিয়ে আমরা কয়েক দফা মিটিং করেছি, ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজসহ অন্য ভোগ্যপণ্যের দাম কমানোর ব্যাপারে আমাদের আশ^স্ত করেছেন। এছাড়াও টিসিবি দিয়ে সারা দেশে স্বল্পমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি চলছে। বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তাছাড়া দেশীয় পেঁয়াজ উৎপাদন শুরু হলে পেঁয়াজের দাম এমনিতেই কমে যাবে।

এ বিষয়ে কথা হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি জানান, ভারত থেকে আমরা ৮ থেকে ১০ হাজার লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আনতাম। আমদানি বন্ধ হওয়ায় এই ঘাটতি বাস্তবসম্মত বিষয়। এটা সহজে কাটিয়ে উঠতে আমাদের আরও কিছুদিন কাজ করতে হবে। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি অযৌক্তিক কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ৫ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ কৃষকের বাড়ি বাড়ি স্টক আছে। চাইলেই কৃষকের ঘরে ঘরে অভিযান পরিচালনা করার সুযোগ নেই। আর এটা অনেকেই পজিটিভলি নেবে না। তবে আমরা আগামীতে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করছি।

ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে ভোগ্যপণ্যের বিশেষ করে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়ে থাকলে তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আসবে। আমাদের সচিব মহোদয় নিজেও বিভিন্ন জেলা সফর করেছেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখানো হচ্ছে। শ্যামবাজারে পাইকারি বাজারে ৭১ টাকা কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। এর বেশি বিক্রি যাতে করতে না পারে সেজন্য সেখানে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা যাতে অযৌক্তিক পর্যায়ে মুনাফা করতে না পারে সে ব্যাপারে আমরা চেষ্টা করছি। আমি নিজেও কয়েকটি বাজারে গিয়েছি, ব্যবসায়ীদের জরিমানা করেছে। টিসিবি প্রতিদিন এক হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ বিক্রি করছে স্বল্পমূল্যে। ফলে আমরা চেষ্টা করছি না, বিষয়টি এমন নয়। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি ব্যবসায়ীদেরও নৈতিকতা থাকা উচিত। শুধু অভিযান পরিচালিত হলেই ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি করবেÑ বিষয়টি যাতে এমন না হয়।