ব্যাংকে চাকরি হারানোর আতঙ্ক

ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

ব্যাংকে চাকরি হারানোর আতঙ্ক

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ১০:১২ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০

print
ব্যাংকে চাকরি হারানোর আতঙ্ক

এবি ব্যাংকে চাকরিচ্যুতির আতঙ্ক এবার ঢাকা ব্যাংকে পেয়ে বসেছে। ব্যাংকটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কমাতে নতুন কৌশল নিয়েছে। ব্যাংকটির শাখায় শাখায় নির্দেশনা পাঠিয়ে বলা হয়েছে, তারা করোনাকালীন ঘোষিত প্রণোদনা চান না এ বিষয়ে লিখিত দিক। চাকরির বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন শাখা থেকে প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনা মেনে এ বিষয়ে লিখিত দেওয়াও শুরু হয়েছে।

ব্যাংকটির রাজধানীর একাধিক শাখার কর্মীরা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস অতিমারি শুরু হওয়ার সময় থেকে আমরা আতঙ্কে আছি। কখনো চাকরি থেকে ছাঁটাই করা কথা বলা হয়েছে, কখনো বেতন কমানো কথা বলা হয়েছে, হাজিরা দেখে ‘লেটকামারদের’ বেতন কাটার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এবার বেতন কাটার এক অভিনব পদ্ধতি কার্যকর করা হচ্ছে। শাখায় শাখায় নির্দেশনা জারি করে বলা হয়েছে সব কর্মীর নির্দিষ্ট ড্রাফট লিখে দেবে তারা করোনাকালীন যে প্রণোদনার নিতে চান না।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কোনো কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। তবে কম্যুনিকেশন ও ব্র্যান্ডিং ডিভিশনের প্রধান খন্দকার আনোয়ার এহতেশাম জানেন না বলে জানান। তিনি বলেন, বেতন কমনোর আলোচনা বেশ কিছুদিন আগে হয়েছিল, সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ঢাকা ব্যাংক আর বেতন কমাবে না। বিষয়টি মানব সম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশের শর্তে বলেন, ব্যাংক খরচ কমানোর উদ্যোগ হিসেবে বেতন না কমিয়ে প্রণোদনা না দেওয়ার এ পথ অনুসরণ করছে।

করোনা অতিমারি শুরু হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা হয় ব্যাংক থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের ন্যায় ঢাকা ব্যাংকও করোনাকালীন প্রণোদনা ঘোষণা করে। কিন্তু জুনের শুরুর দিকে করোনা-অভিঘাত মোকাবিলার অংশ হিসেবে বেতন কমানো ও প্রণোদনার কর্তনের উদ্যোগ নেয় বাণিজ্যিক ব্যাংকটি।  ব্যাংকের কর্মীরা সে সময় জানান, বেতন কমানোর পরে সমালোচনা শুরু হলে বেতন কমানোর অবস্থান থেকে সরে এসে প্রণোদনা কর্তনের উদ্যোগ নেয়। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে করোনাকালীন সময়ের জন্য প্রণোদনা কর্তনের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিলে হাজিরা সমস্যা দেখিয়ে প্রণোদনা কর্তনের উদ্যোগ নেয়। করোনাকালীন যেসব কর্মকর্তা দেরিতে প্রবেশ করেছে বা পাঞ্চিং সিসটেমে একবার পাঞ্চিং করেছে তাদের প্রণোদনা কর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এ রকম প্রায় দেড় হাজার কর্মীর প্রণোদনা কর্তনের জন্য তালিকা করে ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগ। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে সে সময় ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমরানুল হক খোলা কাগজকে বলেন, এ ব্যাপারে ব্যাংকের নির্দেশনা নেই। মানব সম্পদ বিভাগ কীভাবে এটা করছে আমি খতিয়ে দেখব। বিষয়টি পরে আবার খোঁজ নিয়ে জানা যায় লেট বা ত্রটিপূর্ণ হাজিরা দেখিয়ে প্রণোদনা কর্তনের অবস্থান থেকে সরে আসে ঢাকা।

করোনাকালীন প্রণোদনা না কমানোর যুক্তি দেখিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকটির ধানমন্ডি শাখার একজন কর্মকর্তা খোলা কাগজকে বলেন, এমনিতে ঢাকা ব্যাংকের বেতন কম, চার বছর ধরে কোনো ইনক্রিমেন্ট নেই। চার বছর আগে ইনক্রিমেন্ট হয়েছে তাও ৪/৫ শতাংশ হারে। অন্য ব্যাংকের একজন সিনিয়র প্রিন্সিপ্যাল অফিসারের সর্বসাকুল্যে বেতন যেখানে এক লাখ ২০ হাজার টাকার উপরে, ঢাকা ব্যাংকের বেতন সেখানে ৬৫ হাজার টাকা। একই অবস্থা অন্যান্য পদের ক্ষেত্রেও। ফলে করোনাকালীন প্রাপ্ত বেতন দিয়ে চলতে কষ্ট করতে হয়েছে।

এর ফলে এমনিতেই ভালো নেই ঢাকা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এছাড়া করোনাকালীন সময়ের প্রথম দিকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রিকশা বা অন্য কোনো যানবাহনে অফিস করতে হয়েছে। এর ফলে বাড়তি খরচ হয়েছে। সেই সময়ের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা কমানো খুবই অমানবিক। 

প্রসঙ্গত, করোনা আঘাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মুনাফা কমে গেছে-এই অজুহাতে কর্মীদের ছাঁটাই ও বেতন কমাতে কয়েকটি ব্যাংকের উদ্যোগের ফলে পুরো ব্যাংক খাতের কর্মীদের মধ্যে চাকরি হারোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিছু কিছু ব্যাংক কর্মীদের গোপনে ডেকে রিজাইন নিয়ে ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। সর্বশেষ গত রোববার ১২ জুলাই পর্যন্ত এবি ব্যাংকের শতাধিক কর্মীকে ছাঁটাই করলে ব্যাংক খাতে চাকরি হারোনার আতঙ্ক আরও প্রবল হয়। এর সাথে যুক্ত হলো ঢাকা ব্যাংকের প্রণোদনা কর্তনের আতঙ্ক। 

আতঙ্কে ব্যাংকাররা : কর্মী ছাঁটাই বন্ধ বেতন না কমানোর দাবি

গত কয়েক মাসে দেড় শতাধিক কর্মীকে ছাঁটাই করেছে বেসরকারি এবি ব্যাংক। ব্যয় কমানোর নামে এর আগে ওয়ান ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও এবি ব্যাংক তাদের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করে মহামারির এ দুর্যোগের সময়ে আতঙ্কে রয়েছেন ব্যাংকের কর্মীরা। তাই বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে তাদের কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি বা বেতন-ভাতা কমানোর চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসাসহ ব্যয় কমানো ও আয় বাড়ানোর অন্য বাস্তবভিত্তিক পন্থা অবলম্বন করার দাবির জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।

সোমবার (১৩ জুলাই) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মীদের সংগঠন ব্যাংকার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (বিডব্লিউএবি) পক্ষ থেকে সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট কাজী মো. শফিকুর রহমান এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ব্যাংকার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (বিডব্লিউএবি) মনে করে, ব্যাংক কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি বা বেতন-ভাতা কমানো কোভিড-১৯ বা অন্য সংকট মোকাবিলায় সমাধান হতে পারে না। বিডব্লিউএবি আশা করে, সব বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি বা বেতন-ভাতা কমানোর চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসবে এবং ব্যয় কমানো ও আয় বাড়ানোর অন্য বাস্তবভিত্তিক পন্থা অবলম্ব^ন করবে।

তবে করোনা সংকটের মধ্যেও বেশ কিছু ব্যাংক বেতন না কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ইউসিবি, এসবিএসি, প্রাইম ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, এনসিসি ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। এজন্য এসব ব্যাংককে সাধুবাদ জানিয়েছে বিডব্লিউএবি।

বিডব্লিউএবি বলছে, যেসব ব্যাংকে চাকরিচ্যুত বা বেতন কমানো হয়েছে, সেখানকার কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ। অন্য ব্যাংকগুলোতেও চাকরিচ্যুতি বা বেতন কমানোর আতঙ্ক রয়েছে। সাধারণ জনগণ মনে করে, ব্যাংকগুলো তার কর্মকর্তাদের বেতনেরই যদি সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে গ্রাহকরা তাদের আমানতের সুরক্ষার ব্যাপারে নিশ্চিত হবে কীভাবে? এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকের ওপর আস্থা কমে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে উৎসাহ হারায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে আমরা বিরত থাকতে বলেছি। এই করোনা মহামারির সময় তাদের ওপর চাপ পড়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত যেন না নেওয়া হয়। আর সরকার এই সময় করোনা মোকাবিলায় ব্যাংকের মাধ্যমে বেশকিছু আর্থিক প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে। কোনো কারণে সেগুলোও যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। বিবৃতিতে তার এ বক্তব্যকে উদ্ধৃত করেছে বিডব্লিউএবি।

ব্যাংকার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ বলেছে, কোভিড-১৯ মহামারির আবির্ভাবের শুরুতে সরকারি সব অফিসে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ব্যাংক কর্মকর্তারা সে সময়েও ডাক্তার, অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও অন্যান্য সম্মুখযোদ্ধাদের ন্যায় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ব্যাংকিং সেবা দিয়ে এসেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সূত্র মতে, এ পর্যন্ত কোভিড-১৯ মহামারিতে অন্তত ৩৬ জন ব্যাংক কর্মকর্তা মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আনুমানিক ২০০০ জন কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। এ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি বা বেতন-ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিতান্তই ‘অমানবিক’ বলছে বিডব্লিউএবি।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি বা বেতন-ভাতা কমানোর সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিডব্লিউএবি বলছে, এ সিদ্ধান্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের হতাশাগ্রস্ত করবে। তারা কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন এবং ব্যাংকিং সেক্টরে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ‘কোভিড-১৯ ও অন্যান্য যে কোনো আর্থিক সংকট মোকাবিলার জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের অনুপ্রেরণা দেয়ার পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যাতে তারা নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে ব্যাংকের উন্নয়ন ও গতিশীলতায় যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেন। কেননা ব্যাংক কর্মকর্তারাই ব্যাংক কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি।’

বিডব্লিউএবির দাবি : ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত না করা বা পদত্যাগে বাধ্য না করা এবং তাদের বেতন না কমানো। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিকালীন ব্যাংক কর্মকর্তাদের অফিসে কাজ করার বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা করা। বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সংগঠনটি।