শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণায় পোশাকশিল্পে আতঙ্ক

ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ | ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণায় পোশাকশিল্পে আতঙ্ক

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ০৬, ২০২০

print
শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণায় পোশাকশিল্পে আতঙ্ক

তৈরি পোশাক শিল্পজুড়ে এখন চাকরি হারানোর আতঙ্ক শুরু হয়েছে। জুন মাসেই শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হবে- বৃহস্পতিবার তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি রুবানা হকের বক্তব্যে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে যারা কারখানার বিশ^স্ত ও গর্বিত শ্রমিক ছিলেন, স্ব স্ব কারখানার উত্থানের সঙ্গে মিশে ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্যের পর তারা কারখানা থেকে করুণ প্রস্থানের প্রহর গুনছেন।

বৃৃহস্পতিবার শ্রমিকদের করোনা পরীক্ষার জন্য ল্যাব উদ্বোধনকালে রুবানা হক বলেন, করোনা দুর্যোগের কারণে অনেক কারখানা কার্যাদেশ হারিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও কারখানা বন্ধ হবে। এর মধ্যে কিছু কারখানা পুরোপুরিভাবে বন্ধ হবে, কোনো কারখানা আংশিকভাবে বন্ধ হবে। এ অবস্থায় শ্রমিক ছাঁটাই করা ছাড়া তাদের সামনে কোনো পথ খোলা নেই। অনাকাক্সিক্ষত হলেও তাদের এ কাজটি করতে হবে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর নেতৃবৃন্দের আভাস মতে করোনাকে কেন্দ্র করে এ খাতে অর্ধেক শ্রমিক ছাঁটাই হবে। 

শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাব মতে, ঈদের আগে প্রায় এক লাখ শ্রমিক ছাঁটাই বা কারখানা বন্ধজনিত কারণে চাকরি হারিয়েছে। ঈদের পর থেকে আগামী তিন মাসে ৯ থেকে ১০ লাখ শ্রমিক কর্ম হারাবে।

এ ব্যাপারে বিজিএমইএর সহসভাপতি আ. রহিম ফিরোজ খোলা কাগজকে বলেন, তৈরি পোশাক শিল্প যে কাজ হারিয়েছে তাতে ৩০ থেকে ৫০ ভাগ শ্রমিকের কাজ দিতে পারবে না। এ অবস্থায় শ্রমিককে রেখে বেতন দেওয়া উদ্যোক্তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ব্যাপারে একই বক্তব্য নীট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি-বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মো. হাতেম।

তিনি খোলা কাগজকে বলেন, এখন তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ কাজ আছে। আগামীতে হ্রাস বা বৃদ্ধির ব্যাপারে কোনো খবর নেই। ফলে বাড়তি শ্রমিক রেখে বেতন দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের নেই। রুবানা হকের বক্তব্য অনুযায়ী জুন থেকে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হলে আগামী দুই মাস শ্রমিক ছাঁটাই চলবে। আর ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ঠেকবে ১০ লাখে।

 তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের উদ্দেশে এ ধরনের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া করেছেন রাজনৈতিক, সামাজিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ। জুন মাস থেকেই শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হবে- বিজিএমইএ সভাপতির এ ধরনের বক্তব্য দেশের প্রচলিত আইন ও করোনাযুদ্ধের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার বিপরীতে সুবিধাবাদী অবস্থান হিসেবে দেখছেন তারা। তাদের মতে, করোনা মহামারি সরকার শ্রমিক ও শিল্পের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে, শ্রমিক ছাঁটাই না করার ব্যাপারে বারবার নির্দেশনা দিচ্ছে। তারপরও রুবানা হকের এ ধরনের বক্তব্য উস্কানি ও হটকারিমূলক।

বিজিএমইএ সভাপতি হকের বক্তব্যকে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক ও উস্কানিমূলক হিসেবে দেখে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ। জাসদের সভাপতি সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বৈশ্বিক ও জাতীয় দুর্যোগের মধ্যে কীভাবে শিল্প কলকারখানা চলবে, শ্রমিকদের চাকরি ও জীবিকা রক্ষা হবে তা নিয়ে দেশে সরকারসহ অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সম্প্রদায়ও সচেতন আছে এবং ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

সরকার শ্রমিকদের বেতনের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে। ইইউ চার হাজার নয় শত কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। বাতিল হওয়া রপ্তানি কার্যাদেশ বৈদেশিক ক্রেতারা পুনর্বহাল করেছেন। এরকম পরিস্থিতিতে রুবানা হকের অসত্য বক্তব্য দিয়ে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের হুমকি দেওয়া পরিস্থিতি ঘোলাটে করার রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ও উস্কানি ছাড়া আর কিছুই না।

প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু তৈরি পোশাক শিল্পে উস্কানি হিসেবে দেখছে কেউ কেউ। অর্ধেক শ্রমিক ছাঁটাই করা হবে- এ ধরনের বক্তব্যে কারখানার কোনো শ্রমিকই আর শান্তিতে নেই। কারখানার সবচেয়ে দক্ষ ও বিশ্বস্ত শ্রমিকটিই আজ চাকরি চলে যাওয়ার আতঙ্কে আছেন। এ ব্যাপারে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কার্যকরি সভাপতি কাজী রুহুল আমিন বলেন, বিজিএমইএ সভাপতির এ ধরনের বক্তব্য ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন।

শ্রমিকের শ্রমে ঘামে বিকশিত এই শিল্প থেকে শূন্য হাতে বিদায় দিয়ে মালিকরা শ্রমিকদের সঙ্গে সামন্তবাদী আচরণ করেছে। এর ফলে আমাদের সমাজে তীব্র সংকট তৈরি করবে। তিনি বলেন, সর্বশেষ শ্রম মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত সরে এসে করোনা পরিস্থিতিকালীন সময়ে কোনোভাবেই শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে না।

ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের শ্রমিক ছাঁটাইকে শ্রমিক সমাজকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়ার হচ্ছে বলে মনে করেন গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু।

তিনি বলেন, যখন তাদের শিপমেন্টের প্রয়োজন তখন শ্রমিকের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করে গ্রাম থেকে নিয়ে এলো। সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা নিল আবার শ্রমিককে নিয়ে খেলা শুরু করেছে। শ্রমিকরা মালিকের এ ধরনের নিষ্ঠুরতাকে কোনোভাবেই মেনে নেবে না।