করোনায় বাজার চড়া

ঢাকা, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২০ | ২৩ চৈত্র ১৪২৬

করোনায় বাজার চড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০২০

print
করোনায় বাজার চড়া

করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মধ্যে অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণে বাজারে নিত্যপ্রণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। সব ধরনের চালে কেজিপ্রতি বেড়েছে চার থেকে ছয় টাকা। সবজির দামও বেড়েছে দশ থেকে বিশ টাকা পর্যন্ত। পেঁয়াজ এক লাফে সেঞ্চুরির কাছাকাছি অবস্থান করছে। এতে সাধারণ ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। চালের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তাই অসাধু চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হার্ডলাইনে যাচ্ছে সরকার। এ অভিযান আরও জোর করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সঙ্গে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনও চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে অভিযান পরিচালনা করবে। ইতোমধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে মাঠ প্রশাসনকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। দেশে এখন পর্যন্ত ২০ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত একজন মারা গেছেন।

করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই আতঙ্কে মানুষ চালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য বেশি পরিমাণে কিনে মজুত করতে শুরু করেছেন। এ সুযোগে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা কেজি প্রতি চালের দাম চার থেকে ছয় টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, অভিযান পরিচালনা করা ছাড়াও ওএমএসের (খোলা বাজারে বিক্রি) মাধ্যমে চাল বিক্রি শুরু হচ্ছে। করোনার কারণে চালের সংকট দেখা দিলে প্রয়োজনে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, দেশে চালের কোনো সংকট নেই। আমরা ওএমএস ডিলারদের চাল নিয়ে বাজারে বিক্রি করার জন্য বলেছি। আগামী রোববার ডিলারদের বলা হবে। তারা যদি তিন দিনের মধ্যে চাল তুলে বিক্রি না করেন তবে ডিলারশিপ বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ওএমএসে বিক্রি বন্ধ হয়নি। মানুষ কম দামে ভালো চাল পায় এজন্য ওএমএসের চাল কেনে না। এখন যেহেতু চালের দামটা বেশি, এখন চলবে। ইতোমধ্যে ওএমএস ডিলারদের প্রেসার দেওয়া হয়েছে চাল বিক্রির জন্য। হতদরিদ্রদের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চলছে।

চালের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। একেবারে অযৌক্তিকভাবে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। যারা দাম বাড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা শুরু হয়ে গেছে। সাভারে একজনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা একইসঙ্গে জেল দেয়া হয়েছে। আশা করছি, ইচ্ছামত দাম বাড়ানো বন্ধ হয়ে যাবে। যারা কোনো কারণ ছাড়া চালের দাম বাড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। শুধু আমরাই জোরদার করবই না, ভোক্তা অধিদফতর, জেলা-উপজেলা প্রশাসনও অভিযান পরিচালনা করবে।

সবজির দাম বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা সরবরাহ কমে যাওয়ায় ও জোগানের কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ায় অন্যসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি রাজধানীর বাজারে বেড়েছে সবজির দাম। বাজার ঘুরে দেখা গেছে অধিকাংশ সবজির দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা।

গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট কাঁচাবাজার, জিগাতলা কাঁচাবাজার ঘুরে এ চিত্র উঠে এসেছে।

দেশে করোনা রোগীর মৃত্যুর খবর জানার পর হঠাৎ করেই বেড়েছে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম। ক্রেতাদের মতে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, পাইকারি বাজারে জোগানের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনে মজুদ করার প্রতিযোগিতার কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।

বিক্রেতারা বলছেন, দেশে করোনা আতঙ্কে সবজির সরবরাহ কমেছে। এ কারণে দাম বেড়েছে। অনেক জেলা থেকে পণ্য আসছে না। আবার চাষিরাও পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

রাজধানীর কারওয়ানবাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি হিসেবে প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। প্রতি কেজি চিচিঙ্গা ১০ টাকা বেড়ে ১১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। শিমের দাম গত সপ্তাহে ছিল ৫০ টাকা, গতকাল বিক্রি হচ্ছিল ৬০ টাকায়। কাঁচামরিচ ১৫ টাকা বেড়ে ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গাজর ১০ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায়, পেঁপে ৪০ টাকা, কচুর লতি ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাইকারি বাজারে বেগুন ১০ টাকা বেড়ে ৮০ টাকায়, উস্তে ১০০ টাকায়, গাজর ৬০ টাকায়, শসা ১০ টাকা বেড়ে ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

লাউ প্রতিটি আগের সপ্তাহের তুলনায় আকারভেদে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়, জালি কুমড়া ১০ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায়, প্রতি পিস বাঁধাকপি-ফুলকপি ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়।

নিউমার্কেট খুচরা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব পণ্য পাইকারি বাজারের তুলনায় ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।

কথা হয় নিউমার্কেট কাঁচা বাজারের বিক্রেতা রহিম মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। সকালে কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখি প্রতি কেজি সবজিতে ৮ থেকে ১০ টাকা দাম বেড়েছে। তাই খুচরা বাজারে দাম বেশি রাখতে হচ্ছে। আমাদের এখানে মালামাল আনার জন্য পরিবহন খরচ, তারপর কয়েক জায়গায় চাঁদাও দিতে হয়। যার প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে।

বাজারে সবজি কিনতে আসা ক্রেতা আব্দুল্লাহ সরদার বলেন, দেশে সবাই এখন করোনা আতঙ্কে ভুগছেন এটা ঠিক। কিন্তু এজন্য পণ্যের দাম এত বাড়বে এটা ঠিক না। আমার মনে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের একটি মহল সিন্ডিকেট করে এই দাম বাড়িয়েছে।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, করোনার কারণে আমাদের অনেকেরই কাজকর্ম বন্ধ আছে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে সরকারকে। তা না হলে সাধারণ জনগণের ভোগান্তির শেষ থাকবে না।

এদিকে রাজধানীর জিগাতলা কাঁচাবাজার ঘুরেও সবজির বাড়তি দামের চিত্র দেখা গেছে। পাইকারি বাজারের তুলনায় এই বাজারেও ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি দাম রাখা হচ্ছে সব সবজিতে।

মাংসের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৫৮০ টাকা, মহিষের মাংস ৫৮০ থেকে ৬০০ টাকা, খাসির মাংস ৮০০ টাকা। এছাড়া প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা, লেয়ার ২০ টাকা বেড়ে ২৪০ টাকা, সোনালি ২৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।