রিজার্ভ থেকে আয় হারাচ্ছে দেশ

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

রিজার্ভ থেকে আয় হারাচ্ছে দেশ

জাফর আহমদ ১০:০৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩০, ২০১৯

print
রিজার্ভ থেকে আয় হারাচ্ছে দেশ

বিশ্বজুড়ে নীরব অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। আর এর প্রভাব পড়েছে বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। শক্তিশালী মুদ্রাতেও চলছে নিরব মন্দার করাঘাত। এ সব মুদ্রা এলাকাগুলোতে আর্র্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুদের হার কমিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়ে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ থেকে সুদ বাবদ যে আয় করত তা কমে গেছে।

সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন মুদ্রায় রক্ষিত বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৭৪৪ বিলিয়ন ডলার। এই রিজার্ভ বিশ্বের বিভিন্ন মুদ্রায় রক্ষিত আছে। এর মধ্যে আমেরিকান ডলারে রাখা আছে মোট রিজার্ভের ৮০ ভাগ। পাঁচ ভাগ আছে ইউরোতে। আর বাকি ১৫ ভাগ বিশ্বের বিভিন্ন মুদ্রায়। এ সব মুদ্রা অঞ্চলে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রার মান ও ব্যাংক রেট কম-বেশি হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক, লন্ডন, চীন, জাপানসহ ছয়টি দেশের মুদ্রাতে এ সব রিজার্ভ রেখে থাকে। যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার এ সব মুদ্রায় ও মুদ্রা অঞ্চলের সংরক্ষিত সেহেতু এসব ব্যাংকের রেট ওঠা-নামার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি নির্ধারিত হয়ে থাকে। সম্প্রতি আমেরিকা ও ইউরো অঞ্চলে অর্থনৈতিক মৃদু মন্দা হওয়ার কারণে লন্ডন ইন্টার ব্যাংক রেট (লায়বর) রেট কমে যায়। এ কারণে বাংলাদেশে রিজার্ভ থেকে যে পরিমাণ মুনাফা হতো তা কমে গেছে।

বাংলাদেশের রিজার্ভের ৮০ ভাগ বা সাড়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন আমেরিকান ডলারে রিজার্ভ রাখা আছে। যার সুদের হার নির্ধারিত হয়ে থাকে লন্ডন ইন্টার ব্যাংক রেট বা লায়বর-এ। বিশ্বজুড়ে মৃদু অর্থনৈতিক মন্দার কারণে লায়বর রেট কমেছে, সেই সঙ্গে কমেছে রিজার্ভ থেকে হওয়া আয়।

বাংলাদেশ দিন, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক ও বাৎসরিক ভিত্তিকে রিজার্ভ রেখে থাকে। সময়ের পার্থক্যের সঙ্গে সঙ্গে সুদ হারও কম পেয়ে থাকে। সর্বশেষ দেখা যায়, লায়বর রেট দিন বা অভারনাইটে ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ত্রৈমাসিক ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ১২ মাসের সুদ হার ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এক বছর আগেও লায়বর রেট দুই শতাংশের কাছাকাছি ছিল। এরও এক বছর আগে ১২ মাস মেয়াদি লায়বর রেট ছিল ২ দশমিক ১১ শতাংশ। সে হিসাবে এক বছরে গড়ে লায়বর রেট কমেছে প্রায় শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। এতে বাংলাদেশের আয় কমেছে টাকার অঙ্কে প্রায় ৩ হাজার কোটি।

রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় এ আয়কে মুখ্য মনে করছে না বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ এন্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আয় নয়, মুখ্য বিষয় হলো কত ভালোভাবে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা করা যাচ্ছে। বেশি মুনাফার লোভে এমন দেশের রিজার্ভ ব্যাংকে রিজার্ভ রাখা যাবে না, যে দেশে বাংলাদেশের অর্থ নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে। জাপান, ইউরোপ বা চীনা রিজার্ভ ব্যাংকের মতে, এমন দেশও আছে যেখানে রিজার্ভ রাখার বিনিময়ে আয়ের পরিবর্তে কখনো কখনো মূল অর্থ থেকেও কাটা যায়। বাংলাদেশ ওই সব দেশের সঙ্গে ব্যবসা করার কারণে এলসি (ঋণপত্র) খোলার প্রয়োজনে ওই সব দেশে মুদ্রা রাখা হয়।

বিষয়টিকে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, রেমিটেন্স কোনো দেশের মুদ্রায় রাখার সময় কোন রকম মুনাফার আশা না করে কত নিরাপদে এবং চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় সে বিবেচনা করেই রিজার্ভ রাখা হয়। রিজার্ভ বৈদেশিক মুদ্রা হওয়ার কারণে বিদেশেই রাখতে হবে। সুতরাং লাভ-লোকসান বড় কথা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এভাবেই মুনাফা রাখা হয়। তারপর কোনভাবে কোন আয় এলে তা বাড়তি পাওনা।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক ঋণ-অনুদানের অর্থ। বিভিন্ন রকম পণ্য, সেবা, আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ আবার বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। এরপর যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অবশিষ্ট থাকে তা-ই রিজার্ভ। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, কোন দেশের সক্ষমতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৩৩ বিলিয়ন উঠেছিল। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পর সর্বশেষ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৩১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

সম্প্রতি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত প্রায় ৮০০ কোটি টাকা রিজার্ভ হ্যাকাররা চুরি করে। এরপর থেকে আলোচনায় আসে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি। বিদেশের ব্যাংকের রিজার্ভ রাখার পাশাপাশি কীভাবে ব্যবস্থাপনা হয় এবং রিজার্ভ থেকে প্রাপ্ত আয়ও বাদ যায়নি।