দিশাহারা পোশাক শ্রমিকরা

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

দিশাহারা পোশাক শ্রমিকরা

গার্মেন্ট শিল্পে ছাঁটাই

জাফর আহমদ ১০:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৯

print
দিশাহারা পোশাক শ্রমিকরা

নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন আজিজুল ইসলাম। ছয়জনের পরিবারে তিনজন রোজগার করে কোনোমতে সংসার চালাতেন। কারখানা থেকে ক্রেতা চলে যাওয়ায় কাজ কমে গেছে-এমন যুক্তিতে তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। আগামী মাসের সংসারের খরচ কিভাবে মিটবে তা নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন আজিজুল ইসলাম।

আজিজুলের বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। উল্লেখ করার মতো লেখাপড়া নেই আজিজুলের। বয়স ৪০-এর একটু উপরে। চার সন্তান। নিজে, স্ত্রী ও বড় মেয়েটি মিলে তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। মেঝ মেয়ে ও ছোট ছেলে দুজনই প্রাথমিকের ছাত্র। নারায়গঞ্জের সবচেয়ে ঘনবসতি ও অপরিচ্ছন্ন পঞ্চবটীতে ১০ বাই ১০ ফুটের একটি বাসায় বসবাস। তিনজন মিলে মোট রোজগার ছিল ২০ টাকার কিছু উপরে। এ টাকাতেই বাসা ভাড়া, ছয় জনের খাওয়া-পরা, পকেট খরচ ও কোনোমতে দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগান চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কাজ হারানোয় দিশাহারা অবস্থা তার।

গত শুক্রবার বিকালে আজিজুলের পঞ্চবটীর বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সূর্যাস্ত হওয়ার দুই ঘণ্টা আগেই সেখানে অন্ধকার। জানা গেল, ঘরটিতে অন্ধকার তাড়াতে ২৪ ঘণ্টা বাতি জ্বালিয়ে রাখতে হয়। তখনো বাতি জ্বালছিল। তবে বিদ্যুতের খরচ বাঁচাতে কম পাওয়ার এনার্জি সেভিংস বাল্ব। ছয়জনের বসতিতে একটি লোহার খাট, পুরাতন একটি ওয়্যারড্রব, হাঁড়ি-পাতিল রাখার একটি মরচেপড়া পুরাতন র‌্যাক ও ডিসের লাইনসহ ১৬ ইঞ্চি টেলিভিশন। পুরো ঘরই নিত্যব্যবহার্য এসব কিছুতে ভরা। দেওয়াল জুড়ে লেপটে আছে সর্বকনিষ্ঠ শিশুর আঁকিবুকি।

আজিজুলের সঙ্গে কথা বলার সময় উপস্থিত ছিলেন স্ত্রী ও সন্তানরা। সবার মুখোবয়ব জুড়ে হতাশার ছাপ। আজিজুল জানালেন, তার কারখানায় কাজ না থাকার কারণে তাকেসহ কয়েকজনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। কারখানা ছাড়ার সময় কেন চাকরি ছাড়া করা হচ্ছে-জিজ্ঞাসা করা হলে তাকে জানানো হয়, বায়াররা চলে যাচ্ছে। সব শ্রমিককে আর রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আপাতত যাও, খোঁজ রেখ, কাজ এলে আবার এসো। কারখানা থেকে বিদায়ের সময় আগের মাসের বেতনটা ধরিয়ে দেওয়া হয়, অন্য কোনো পাওনা মুখেই তোলেনি। আজিজুলের আকাশ ভেঙে পড়ে। স্ত্রী, মেয়ে ও নিজে মিলে যে বেতন পেতেন তা দিয়ে সংসারটা কোনোমতে চলে। এই বয়সে তাড়াতাড়ি চাকরি পাবে! কিভাবে চলবে বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া বা সন্তানের স্কুলে পড়ার খরচ!

এমন ছাঁটাই চলছে রাজধানীর মিরপুরে, সাভারের ফুলবাড়িয়ায় ও জিরানীতে, আশুলিয়ার জামগড়ায়, গাজীপুরের টঙ্গী ও বড়বাড়ী এলাকায়। এসব শিল্প এলাকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হচ্ছে বা কাজ কমে যাচ্ছে। আর মালিকপক্ষ বায়ার চলে যাওয়ার অজুহাতে শ্রমিকদের ছাঁটাই করছে। কোনো কোনো কারখানা মালিক শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না করেই পালিয়ে যাচ্ছেন। আর প্রশাসন কারখানার কাপড়, যন্ত্রপাতি বিক্রি করে শ্রমিকদের কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করছে। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, আশুলিয়ার জামগড়া, উত্তরার দক্ষিণখানে ও গাজীপুরের টঙ্গীতে ট্রেড ইউনিয়ন করার দায়ে শ্রমিকদের মাস্তান দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে বের করে দেওয়া হচ্ছে।

এসব শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানা থেকে চাকরিচ্যুত করে বের দেওয়ার সময় শুধু আগের মাসের বেতনটুকুই দেওয়া হচ্ছে। আইন অনুযায়ী অন্য যেসব পাওনা আছে তার কিছুই দেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে দোকান বাকি, বাড়িভাড়া, সন্তানের খাওয়ার, স্কুলের খরচ মেটানো নিয়ে দিশাহারা হয়ে অকূলপাথারে পতিত হচ্ছেন। বিশেষ করে যে শ্রমিক পরিবারে একমাত্র কর্মসক্ষম ব্যক্তি আছেন এবং চাকরি হারাচ্ছেন সেই পরিবারটি বড় অসহায় হয়ে পড়ছে।

শ্রমিকদের এই চাকরিচ্যুতির সময় মালিকরা যে অজুহাত দেখাচ্ছে তা লোক দেখানো বলে মনে করেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আক্তার। তিনি বলেন, রপ্তানি হ্রাসের যে কথা বলা হচ্ছে এটা অস্বাভাবিক নয়। চলতি জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে যে রপ্তানি কমেছে এ হ্রাস মূলত কোরবানির ছুটি থাকার কারণে। এ সময়ে ছুটি গেছে পূজার। এ ছাড়া প্রতি অর্থবছরের শুরুতে রপ্তানি কিছুটা কমে। এসব কারণে রপ্তানি কিছুটা কমেছে। আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি বাড়বে। তখন পুরো বছরে রপ্তানি আয় আবার ট্র্যাকে চলে আসবে। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়টি ভিন্ন। এ বছর শ্রমিক আগের বছরে চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এর মূলে রয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন করার চেষ্টা করা।

বিষয়টিকে তৈরি পোশাক শিল্পে ভয়াবহ মন্দা বলে মনে করেন নীট তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা সমিতি-বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, বাজার হারানোর মধ্য দিয়ে ছোট তৈরি পোশাক কারখানার উদ্যোক্তারা এক আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হয়েছেন। তারা জীবনের শেষ সম্বলটুকু বন্ধক রেখে ঋণ নিয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ক্রেতারা কার্যাদেশ না দেওয়ার কারণে দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না করতে পারার কারণে কারখানার মেশিনপত্র পর্যন্ত বেহাত হয়ে যাচ্ছে। মালিকদের এই দুরবস্থা বলতে বলতে আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন এই উদ্যোক্তা।

তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের এ দুরবস্থার কারণ হিসাবে মোহাম্মদ হাতেম উল্লেখ করেন, তৈরি পোশাকের বিদেশি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারানো এবং বাংলাদেশি টাকা ডলারের বিপরীতে অতিমূলায়িত হওয়া। ফলশ্রুতিতে তারা পাশের দেশ ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারে চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি অন্যতম প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামে চলে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের তৈরি পোশাক এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে পতিত হচ্ছে। সরকার দৃশ্যমান উদ্যোগ না নিলে আগামীতে আরও খারাপ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।

এদিকে তৈরি পোশাক রপ্তানির চিত্রে দেখা যায় রপ্তানি আয়ের কিছুটা অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশের উপরে। আগের ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অর্ধেক। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৫৫০ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম।