তারল্য সংকটের ঘাই কৃষিঋণে

ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

তারল্য সংকটের ঘাই কৃষিঋণে

বিতরণ-আদায় দুই-ই কমেছে

জাফর আহমদ ১০:৩৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০১৯

print
তারল্য সংকটের ঘাই কৃষিঋণে

তারল্য সংকট যেন ব্যাংকিং খাতের অনিবার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরজুড়ে ব্যাংক খাতের এই তারল্য সংকটে অতিক্রম করতে হয়েছে। নতুন বছর শুরুই হয়েছে তারল্য সংকট দিয়ে। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকম উদ্যোগ গ্রহণের কথা শোনা গেছে। ব্যাংকিং খাতের এ সংকট কৃষিঋণকেও ছুঁয়েছে। তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেকই অনর্জিত থেকে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ছয় হাজার ৩১ কোটি টাকা। আর বিতরণ হয়েছে তিন হাজার ৫৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম। গত বছর ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে বিতরণ হয়েছিল লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬৪ শতাংশ। এ বছর প্রায় চার শতাংশ কম বিতরণ হয়েছে। গত অর্থবছর শুরু থেকে তারল্য সংকট শুরু হওয়ার কারণে কৃষিঋণ বিতরণে তারল্য সংকটের খুব একটা বেশি ছোঁয়া লাগেনি। এ বছর তারল্য সংকট বেশি তীব্র আকার ধারণ করার কারণে ঋণ বিতরণে এর ছোঁয়া লেগেছে।

ঋণ বিতরণের পাশাপাশি আদায়েও তারল্যের ছোঁয়া লেগেছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে আদায় হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। যা মোট ৪২ হাজার ২২৭ কোটি ২৯ টাকার ১০ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আগের বছরে আদায় হয়েছিল হাজার ৫০৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা মোট ৩৯ হাজার ৯০৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকার ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। আদায় কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ।

ঋণ বিতরণের এই হ্রাসকে খারাপ দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, বছর সবেমাত্র শুরু। মাত্র তিন মাস পার হয়েছে। আগামী মাসগুলোতে বিতরণের এ হার বাড়বে, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। তবে কৃষেঋণ বিতরণের এ বিষয়কে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ব্যাংকের অন্য একটি সূত্র। তাদের মতে, এবার উত্তরাঞ্চলে বন্যাতে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে আমান ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকরা নতুন উদ্যোমে কাজ শুরু করেন। এ কারণে কৃষিঋণের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু উল্টো কমে যাওয়া এবং একইসঙ্গে কম আদায় হওয়া মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। তাদের মতে, ব্যাংকগুলো কৃষিঋণ দিতে না পারার কারণে কৃষিঋণ কমে যেতে পারে বলে মনে করেন আর্থিক খাতের ওই সূত্রটি।

কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনীহা আছে। কৃষকরা কম পরিমাণ ঋণ নেন, এ ঋণে সুদের হার বেঁধে দেওয়া হয়েছে, পরিচালন ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি। এসব কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কৃষিঋণ বিতরণে অনীহা দেখায়। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের দুই শতাংশ কৃষি ঋণ বিতরণ করতে হবে। যে সব ব্যাংকের শাখা কৃষকের নাগালের মধ্যে নেই সে সব ব্যাংককে এনজিওর মাধ্যমে বিতরণ করতে হবে। গত কয়েক বছরে এর ফলাফলও ভালো হয়েছে। কিন্তু গত বছর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটে থাকায় কৃষিঋণ বিতরণ কমিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব এ বছরও পড়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মোট কৃষিঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ২৪ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে আটটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিতরণ করবে ১০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। আর দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিতরণ করবে ১৩ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত আট বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে তিনটি ব্যাংক ও ৩৮ বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে আটটি বাণিজ্যিক ব্যাংক কৃষিঋণ বিতরণ শুরুই করতে পারেনি।