‘রিট পিটিশনে অর্ধেক অর্থ জমা রাখতে হবে’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

‘রিট পিটিশনে অর্ধেক অর্থ জমা রাখতে হবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক ৪:৫৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০১৯

print
‘রিট পিটিশনে অর্ধেক অর্থ জমা রাখতে হবে’

কোনো গ্রাহক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিলেন। ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেই একপর্যায়ে তিনি খেলাপিতে পরিণত হলেন। এ খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আদালতে মামলা করলেই খেলাপি ঋণগ্রহীতারা দ্রুততার সঙ্গে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন রুজু করে চলমান মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। ফলে খেলাপি আদায়ের পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে যায় অথবা পড়তে হয় দীর্ঘসূত্রতায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সার্বিক আর্থিক খাত।

তবে খেলাপি ঋণ আদায়ে আসছে কঠিন সিদ্ধান্ত। অনাদায়ী ঋণ আদায়ে আদালতে চলমান মামলার বিরুদ্ধে রিট পিটিশন দাখিলের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের ন্যূনতম ৫০ শতাংশ অর্থ জমা দেয়ার বিধান রেখে আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, সম্প্রতি চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা লিজিং কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর সভার সূত্র ধরে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সভায় প্রিমিয়ার লিজিংয়ের চেয়ারম্যান এ জেড এম আকরামুল হক বলেন, অনাদায়ী ঋণ আদায়ে আদালতে মামলা করা হলেই খেলাপি ঋণগ্রহীতারা দ্রুততার সাথে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন রুজু করে চলমান মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে রিট পিটিশন দায়েরকালে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমার বাধ্যবাধকতা রেখে আইন করা হলে রিট পিটিশনের সংখ্যা কমে আসবে এবং অনাদায়ী অর্থ দ্রুত আদায় করা সম্ভব হবে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ এবং আইনি অবকাঠামো পরিবর্তনের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ‘মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট’, 'নেগোসিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট', 'ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্ট, ১৯৯১', 'ফাইন্যান্স কোম্পানি অ্যাক্ট, ১৯৯৩', 'ইনসলভেন্সি অ্যাক্ট', 'এমালগেমেশন অ্যাক্ট' সমূহ যুগোপযোগীকরণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য ক্রাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করা হবে মর্মে তিনি মতামতও ব্যক্ত করেন। অনাদায়ী ঋণ আদায়ে আদালতে চলমান মামলার বিরুদ্ধে রিট পিটিশন দাখিলের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের ন্যূনতম ৫০ শতাংশ অর্থ জমা দেয়ার বিধান রেখে আইনি সংস্কারের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। একই সাথে খেলাপি ঋণের সমস্যা দূরীকরণে সরকার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়নের কাজ চলছে।

আদালতে রুজুকৃত মামলাসমূহ নিষ্পত্তিকরণেও অর্থমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেন। এক্ষেত্রে মামলাসমূহ নিষ্পত্তীকরণে সময় নির্ধারণ, অহেতুক মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি রোধে পদক্ষেপ নেয়ার কথাও জানান। একই সঙ্গে ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা লিজিং কোম্পানিগুলোকে নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ এবং তাদের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথাও জানান তিনি। এছাড়া সব ক্ষেত্রে আইন মান্য করা, বিশেষত মানুষের কাছ থেকে গৃহীত আমানতের নিরাপত্তা বিধান ও দক্ষতার সঙ্গে সেবা প্রদানের মাধ্যমে সবার আস্থা অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন অর্থমন্ত্রী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এভাবে রিট পিটিশনের ফলে আদালতে আটকে আছে ব্যাংকের প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। বছরের পর বছর মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের আদায়ও থেমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, যেসব খেলাপি ঋণ মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে, ওই সব ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলো আদালতে মামলা করে। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখন জমে থাকা মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৫৫ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ের জন্য সাধারণত চার ধরনের আদালতে গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করে। আদালতগুলো হলো- অর্থঋণ আদালত, দেউলিয়া আদালত, সার্টিফিকেট আদালত ও দেওয়ানি আদালতে। এর মধ্যে অর্থঋণ আদালতেই বেশির ভাগ মামলা করা হয় এবং এ আদালতেই ব্যাংকের বেশির ভাগ অর্থ আটকে আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত প্রতি ছয় মাস পর হালনাগাদ তথ্য দিয়ে মামলার বিবরণী তৈরি করে। সর্বশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে গত ৩০ জুনভিত্তিক তথ্য দিয়ে। মামলার সংখ্যা ও আদায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) তুলনায় আগের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে এবং এর বিপরীতে বেশি খেলাপি ঋণ আদায় হয়েছে। যেমন- গত ছয় মাসে আদায় হয়েছে মোট বিচারাধীন মামলার বিপরীতে আটক খেলাপি ঋণের ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা আগের ছয় মাসে ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

আদালতভিত্তিক মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ আটকে আছে অর্থঋণ আদালতে। যেমন- গত জুনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এখন ৬২ হাজার ২০৪টি। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর দাবি করা টাকার পরিমাণ এক লাখ ১৮ হাজার কোটি। সার্টিফিকেট আদালতে মামলার সংখ্যা এক লাখ ৫৭ হাজার।

এর বিপরীতে দাবি করা টাকার পরিমাণ ৫৩৩ কোটি। দেউলিয়া আদালতে মামলার সংখ্যা ১৬৫টি। এর বিপরীতে দাবির পরিমাণ ৫২১ কোটি। দেওয়ানি আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৫ হাজার ৫১৪টি। এর বিপরীতে দাবি করা টাকার পরিমাণ ৪২ হাজার ৫৪ কোটি।