বিপর্যয়ের পদধ্বনি পুঁজিবাজারে

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

বিপর্যয়ের পদধ্বনি পুঁজিবাজারে

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০১৯

print
বিপর্যয়ের পদধ্বনি পুঁজিবাজারে

পুঁজিবাজারে দরপতনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে চলতি অর্থবছর। এখনো দরপতন চলছেই। গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ দিনটিও শেষ হয়েছে পতনের সংবাদ দিয়ে। ফলে অব্যাহত দরপতনের মধ্যে বড় ধরনের বিপদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কারণ গত এপ্রিল-মে মাসেও প্রায় একই অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বিনিয়োগকারীদের। গত বছরের একই সময়ে টানা দরপতনে মাত্র ২৫ দিনেই বাজার থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।

এ শঙ্কায় নিজেদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা চেয়ে বিক্ষোভ করছেন দিশাহারা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অব্যাহত দরপতনে গতকালও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বিক্ষোভ করেছেন বিনিয়োগকারীরা। বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আয়োজিত এ বিক্ষোভ থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেনের পদত্যাগ দাবি করেছেন।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী বলেন, দরপতনের প্রতিবাদে আমরা রোজার ঈদের আগেও মানববন্ধন এবং বিক্ষোভ করেছি। প্রতীকী গণঅনশন করেছি। শেয়ারবাজারের জন্য বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরেছি। কিন্তু পতন ঠেকাতে কেউ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমরা যে দাবিগুলো জানিয়েছি তা বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে লাগাতার কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।

বৃহস্পতিবার ডিএসইর (ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৮ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২২২ পয়েন্টে। অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক ৩ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮৫৭ পয়েন্টে নেমে গেছে। আর শরিয়াহ সূচক ৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯৪ পয়েন্টে। একই দিন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সব ক’টি মূল্যসূচকের পতন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চলতি সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসেই দরপতন ঘটলো।

গত দুই মাসে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স নেমেছে সর্বনিম্ন স্থানে। গড়পড়তা লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ডিএসই প্রধান বা ডিএসইএক্স সূচক ৪৯ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ২৩০ পয়েন্টে। এই সূচকটি ১ মাস ২৬ দিনের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে গেছে। এর আগে গত ১৫ মে সূচকটি আজকের থেকে কম স্থানে অবস্থান করছিল।

মূলত গত ১৩ জুন বাজেট ঘোষণার পর থেকেই শেয়ারবাজারে পতন শুরু হয়। বাজেট পাসের পরও পতনের অব্যাহত ধারা কাঁপুনি বাড়িয়ে দিচ্ছে বিনিয়োগকারীদের বুকে। কারণ, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাওয়ার মতোই বিনিয়োগকারীরা প্রতিমুহূর্তের ঝুঁকিতে রয়েছেন দুই পুঁজিবাজারে। শেষ সপ্তাহে টানা দরপতন সে ভয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত বছর একই সময়ে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া শেয়ারবাজারে দরপতন শুরু হয়। সিন্ডিকেটের কারসাজিতেই মূলত আকস্মিক ও টানা দরপতনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু গত ডিসেম্বরের ভোটের পরপরই পুঁজিবাজারে এক স্বস্তি এসেছিল। জানুয়ারি মাসে প্রতিদিন লেনদেন হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। এখন সে সংখ্যা নেমে এসেছে ৩০০ কোটিতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার স্থিতিশীল করতে না পারলে শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীই নন, ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্রোকারেজ হাউসের মালিকরাও। লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এখন এমনিতেই নাভিশ্বাস উঠেছে সংশ্লিষ্ট সবার।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজাটে শেয়ারবাজারের জন্য বেশকিছু প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট এমন জায়াগায় পৌঁছেছে যে, সে প্রণোদনাও এখন কাজ দিচ্ছে না। কারণ শেয়ারবাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কারসাজির মাধ্যমে বারবারই লুটে নিয়ে গেছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা। সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সিন্ডিকেটের কারসাজি ঠেকাতে পারেনি। গত এপ্রিল-মে মাসে টানা দরপতনে মাত্র ২৫ দিনের ব্যবধানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূলধন থেকে উধাও হয়ে যায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।

২০১০ সালের ভয়াবহ দরপতনে পর আবার নতুন করে পথে বসার উপক্রম হয় বিনিয়োগকারীদের। বাজেটে প্রণোদনা বাড়লে বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তরিক হলে পুঁজিবাজারের চেহারা ফিরবে-এ আশায় বসে ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু বাজেটের পর উল্টো নিম্নগামী হয়েছে বাজারের সূচক। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। শেয়ার বাজারে প্রতিদিনই মূলধন পতনের পরিমাণ বাড়ছে। শুধু ছোট মূলধনী কোম্পানি নয়, বৃহৎ কোম্পানির শেয়ার কিনেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের দাবি এসব চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কারসাজিকারীদের হাতে বাজার ছেড়ে দেওয়ার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষক ও ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী বলছেন, নতুন বাজেটে পুঁজিবাজারে জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সবার প্রত্যাশা ছিল বাজেট পাসের পর বাজার ভালো হবে। কিন্তু সেটা না হয়ে উল্টো বাজারে দরপতন চলছেই।

গ্রামীণফোন এবং পিপলস লিজিংয়ের শেয়ারের দর অস্বাভাবিক কমে যাওয়া, ব্যাংকগুলোর কাছে টাকা না থাকা, গ্যাসের দাম বাড়ানোয় কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে যাওয়ার শঙ্কায় এই দরপতন চলছে বলে মনে করেন ডিবিএ সভাপতি। শাকিল রিজভী বলেন, ‘গ্রামীণফোনের শেয়ারের দামের কিন্তু একটা বড় প্রভাব আছে আমাদের পুঁজিবাজারের সূচকের ওপর। এই শেয়ারের দাম কমে গেলে সূচক বড়ভাবে কমে যায়। আর বাড়লে বেশ বেড়ে যায়। উদাহরণ দিয়ে বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দর ছিল ৪১০ টাকা। এখন তা ৩৪০ টাকায় নেমে এসেছে। এ সময়ে ৬০ টাকা দর হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর একটা বড় প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর কাছে টাকা নেই। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে বার বার তাগাদা দেওয়ার পরও ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামেনি। সবমিলিয়ে তারল্য সংকটে বাজারে লেনদেন বাড়ছে না।’

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিকেও নতুন সমস্যা আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ায় কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমতে পারে বলে ধারণা করছে বিনিয়োগকারীরা। যার প্রভাব পড়েছে বাজারে।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য কিছু ‘প্রণোদনা’র ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ৯ জুলাই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পুঁজিবাজার উন্নয়নে সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। কিন্তু এর পরও কিছুতেই পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে একাধারে তারল্য ও আস্থার সংকট চলছে। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও মুদ্রা পাচারের কারণে বেশির ভাগ ব্যাংকে নগদ টাকার তীব্র অভাব চলছে। ব্যাংকে তারল্য তথা নগদ টাকার সংকট থাকায় পুঁজিবাজারেও তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বাজেটের পর বাজারে কোনো গতির আভাস দেখা না যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় টান পড়েছে। এর মধ্যেই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো খবর এসেছে বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘পিপলস লিজিং’ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পরিচালকদের অনিয়ম, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে কোম্পানিটিকে অবসায়িত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পিপলস লিজিংয়ের ঘটনার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এরই মধ্যে যেসব কোম্পানির অস্তিত্ব বর্তমানে কেবল কাগজে-কলমে রয়েছে, লভ্যাংশ ও লিস্টিং ফি দিচ্ছে না, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। মূল মার্কেট থেকে একেবারে তালিকচ্যুত করে শেয়ারবাজারকে জঞ্জালমুক্ত করার উদ্দেশ্যে ডিএসই উদ্যোগ নিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠকে বসেছে সংশ্লিষ্টরা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত (রাত ৯টা) বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

ডিএসই সূত্র জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের ৫ বছরের বেশি ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ না দিলে এবং ৩ বছরের বেশি সময় উৎপাদন না থাকলে ওইসব কোম্পানিতে তালিকাচ্যুতি করা হয়। এ তালিকায় রয়েছে-মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, বিচ হ্যাচারী লিমিটেড ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ (বিডি) লিমিটেড, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, দুলামিয়া কটন স্পিনিং, সমতা লেদার কমপ্লেক্স, শ্যামপুর ?সুগার মিলস, জিলবাংলা সুগার মিলস, ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ইন্ডাস্ট্রিজ, সাভার রিফ্যাক্টরিজ, বেক্সিমকো সিনথেটিকস, জুট স্পিনার্স, শাইনপুকুর সিরামিকস, সোনারগাঁও টেক্সটাইল এবং ইনফরমেশন সার্ভিস নেটওয়ার্ক।

দুর্বল এসব কোম্পানিকে অনেকদিন ধরেই রিভিউয়ে রেখেছে ডিএসই। এসব কোম্পানি ডি-লিস্টিং (তালিকাচ্যুত) করা হবে কিনা বা বিকল্প কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই বৈঠক চলছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিভিডেন্ড ঘোষণা ও উৎপাদনে না থাকলেও হরহামেশাই ডিএসইর রিভিউর তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরে উল্লম্ফন দেখা যায়। মূলত স্বল্পমূলধনী হওয়া কোম্পানিগুলোর শেয়ারে নিয়মিত বিরতিতে কারসাজি হয়। তাই এদের বাজার থেকে উচ্ছেদ করাই শ্রেয়।