বিদেশি বিনিয়োগে কর্মসংস্থানে ভাটা

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

বিদেশি বিনিয়োগে কর্মসংস্থানে ভাটা

১০ বছরে কমেছে ৬৩ শতাংশ

জাফর আহমদ ১:৫৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৪, ২০১৯

print
বিদেশি বিনিয়োগে কর্মসংস্থানে ভাটা

বিদেশি বিনিয়োগ কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রতিবছর বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লেও কমছে কর্মসংস্থান। গত ১০ বছরের তথ্যে দেখা যায় বিদেশি বিনিয়োগে কর্মসংস্থান তিনভাগের প্রায় দুইভাগই কমে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সমীক্ষাতে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের এ ধারা আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

 

তিনি খোলা কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে এখন প্রচুর পরিমাণ কর্মসংস্থান প্রয়োজন। এ জন্য বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ বিনিয়োগ হতে হবে উৎপাদনমুখী ও শ্রমঘন শিল্পে। বিনিয়োগ বাড়ল অথচ কর্মসংস্থান কমে গেল- এমন হলে আগামীতে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগে সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে ৫ লাখ ৩ হাজার ৬৬২ জন। এরপরের অর্থবছর ২০১১-১২ এ কর্মসংস্থান ছিল ৪ লাখ ৫১ হাজার ১১৫ জন। এরপরের বছরগুলোতে কর্মসংস্থান কমতে কমতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে এর ধারেকাছে নেই। তথ্যে উল্লেখ করা হয়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৯ হাজার ৭০৯ জন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৪৩ জন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ লাখ ২৬ হাজার ৪১১ জন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে কর্মসংস্থান দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪৯২ জন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কর্মসংস্থান নেমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৯০৯ জনে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫৪৬ জন। সর্বশেষ বিদায়ী অর্থবছরে কর্মসংস্থান কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৯০ হাজারের নিচে। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১০ বছর আগের যেখানে কর্মসংস্থান ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার ৬৬২ জন, ১০ বছর পরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজারের নিচে। কর্মসংস্থান হ্রাসের হার প্রায় ৬৩ শতাংশ বা দুই-তৃতীয়াংশ।

বিনিয়োগ বাড়লেও কেন কর্মসংস্থান কমছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এর একাধিক কারণ আছে। যে সব বিদেশি বিনিয়োগ আসছে সেগুলোর বেশির ভাগই মূলধনঘন ও উচ্চমাত্রায় যান্ত্রিকায়ননির্ভর। মোটা দাগে বলা যায় প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।

তার মতে, বিনিয়োগের প্রধান উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান হয়তো কম হচ্ছে, কিন্তু টেকনোলজি স্থানান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে আগের চেয়ে শ্রমের মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কম শ্রমিক দিয়ে বেশি উৎপাদন করার দিকে মনোযোগী হয়েছেন। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সুবিধা বেড়েছে।
তৌফিক আহমেদ বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লেও কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ার আরও একটি কারণ হলো, দেশে উচ্চমাত্রার কারিগরিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ বেড়েছে।

মানুষের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন উচ্চ কারিগরিনির্ভর প্রডাক্ট ব্যবহার হচ্ছে। এ সব পণ্য উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশমুখী হচ্ছে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সে উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, হচ্ছে না। মূল পণ্যটি তৈরির ক্ষেত্রে হয়তো বেশি লোক লাগছে না; কিন্তু এর পশ্চাদমুখী ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য বাড়তি লোক ঠিকই নিয়োগ দিচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ কারিগরিনির্ভর এ সব বিনিয়োগ থেকে স্থানীয় লোকজন প্রযুক্তি রপ্ত করে দক্ষজনশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। টেকনোলজি স্থানান্তর হচ্ছে। তার মতে, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান হয়তো হচ্ছে না, কিন্তু অন্য যে সব সুবিধা হওয়ার কথা সেগুলো আমরা পাচ্ছি।’

এ ব্যাপারে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সদস্য নাভাস চন্দ্র ম-ল বলেন, বিনিয়োগ বড় হলে বেশি কর্মসংস্থান হয়। বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের লিপিবদ্ধ হওয়া তথ্যে বিনিয়োগ পরিস্থিতির বড় চিত্র প্রতিফলিত হয় না। এ কারণে বেশি কর্মসংস্থান চোখে পড়ে না। অন্যদিকে বস্ত্রখাতের শ্রমঘন শিল্পে এখানে বিনিয়োগ হলেও বিনিয়োগচিত্রে তা প্রদর্শিত হয় না। আপাতদৃষ্টে তাই মনে হয়, বিনিয়োগ বাড়লেও কর্মসংস্থান সেভাবে হচ্ছে না।

১০ বছরে কর্মসংস্থান কমলেও বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ নিবন্ধন গত তিন বছরে প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিনিয়োগ চিত্রে দেখা যায়, কৃষিতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে। এরপরই রয়েছে প্রকৌশল ও বস্ত্র খাতে। ২০১০-১১ অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে ৩,৫০৫ মিলিয়ন ডলার, ২০১২-১৩ সালে ২৮০০ মিলিয়ন ডলার; ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ২,১২৮ মিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন একেবারে তলানিতে নেমে দাঁড়ায় ৫১৫ মিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন প্রতাশ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। এ বছর বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ নিবন্ধন হয় ১০,৩৭৭ মিলিয়ন ডলার। পরের বছরগুলোতে বিনিয়োগ নিবন্ধন কিছুটা কমলেও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকে।

দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ ১৫-৬৪ বছরের। দেশে যুব কর্মশক্তির হার সারা বিশে^র প্রথম ১০ দেশের অন্যতম। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা মনে করছেন, এই বিপুল কর্মক্ষম জনশক্তির কর্মসংস্থান প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন বিদেশি বিনিয়োগ। বিশেষ করে শ্রমঘন শিল্পে এ বিনিয়োগ আসতে হবে। বর্তমান সরকারের রূপকল্প-২০৪১ অনুযায়ী, ২০২১ অনুযায়ী দেশকে মধ্যম আয় এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ আকাক্সক্ষার বাস্তবায়নে বিদেশি বিনিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশে উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করার জন্য যে বিদেশি ঋণ নেওয়া হচ্ছে তার পরিশোধও নির্ভর করছে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর। বিনিয়োগ বাড়লে রপ্তানি বাড়বে, রপ্তানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়বে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমানে বৈদেশিক বিনিয়োগ আশানুরূপ নয়। আবার যা আসছে তাও অনেকটা টেকনোলজিনির্ভর, শ্রমঘন নয়। ফলে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথে বৈদেশিক বিনিয়োগ আশা জাগাতে পারছে না।