দাম বাড়ে কিন্তু কমে কি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

বাজেট আসে বাজেট যায়

দাম বাড়ে কিন্তু কমে কি

রহমান মুফিজ ১১:০৮ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০১৯

print
দাম বাড়ে কিন্তু কমে কি

প্রতিবছর জুন মাস কারও পৌষ মাস বা কারও সর্বনাশ হয়ে আসে। কারণ এ মাসেই জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ হয়। বাজেটের প্রভাব পড়ে ব্যবহার্য এবং ভোগ্যপণ্যের বাজারে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বাজেটের প্রভাব পড়তে শুরু করে বাজেট পাসের আগেই। বাজেটে যে পণ্যের দাম বাড়ার কথা তা বাজেট উত্থাপনের দিন থেকেই বেড়ে যায়। আর যে পণ্যের দাম কমার কথা, তা গোটা বছরে তো কমেই না, উপরন্তু ক্রমাগত বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। অন্যদিকে কোনো পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে সেটা কখনো কমেছে-এমন রেকর্ডও নেই ভোক্তাদের কাছে।

গত ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট এটি। আওয়ামী লীগের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার এ বাজেট উত্থাপনের পরপরই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে।

বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, দেশের মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের মানুষ নয়, যারা অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী, নতুন অর্থবছরের বাজেট তাদেরই সুবিধা দেবে। নতুন বাজেটে কৃষককে ধানের লোকসান বাবদ প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয়সীমাও বাড়ানো হয়নি। কিন্তু সম্পদের সারচার্জের সীমায় ছাড় দেওয়া হয়েছে। ধনীরা ফ্ল্যাট কিনতেও করছাড় পেয়েছে। পোশাক রপ্তানিকারকরাও পেয়েছেন নগদ ভর্তুকি।

তিনি বলেন, ‘এটা স্বচ্ছ যে বাজেট উচ্চ আয়ের মানুষকে অনেক বেশি সুযোগ দিচ্ছে। দেশের মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে বিকাশমান মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এটা থেকে খুব বেশি উপকৃত হবেন না।’ যে সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, সে সমাজ আজ হোক কাল হোক টেকে না বলেও মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজেটে গোটা দেশের বিভিন্ন খাতে অর্থ প্রাক্কলন, আয় ও ব্যায়ের খাত নির্ধারণ করে থাকে সরকার। এ জন্য বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় শুল্ক, মূসক বা করারোপ, প্রণোদনা, ভর্তুকি দেওয়া হয়। এসবের ওপর ভিত্তি করে ব্যবহার্য এবং ভোগ্যপণ্যের দাম পুনর্নির্ধারণ হয় বা স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বাজেট এলেই বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। বাজেট পাসের আগেই বেড়ে যায় নিত্যপণ্যের দাম।

উত্থাপিত বাজেটে আমদানিকৃত পণ্যে শুল্কারোপের প্রস্তাব রাখার সঙ্গে সঙ্গেই বেড়ে গেছে ভারতীয় পিয়াজ, আদা, রসুন, সিগারেট, চিনি, গুঁড়োদুধসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম। এমনকি মোবাইল খরচ ও স্মার্টফোনের দামও কোথাও কোথাও বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা। স্বর্ণ আমদানিতে খরচ কমানোর প্রস্তাব হলেও বাজেট প্রস্তাবের দিন রাতেই স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি এক হাজার টাকার ওপরে বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। ভোক্তাদের অভিমত স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের এটা একটা কৌশল। বাজেট পাসের পর যখন স্বর্ণের দাম কমবে তখন বাড়তি দাম থেকেই কমাবে।

ভোক্তাদের অভিযোগ সরকার নয়, ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সিন্ডিকেট মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারের জিনিসপত্রের দাম নিয়ে ভোক্তাদের ভোগান্তি নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। তা না হলে বাজেট পাসের আগে কী করে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। আর যে দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায় সেটা কমানোর কোনো নির্দেশনা বা প্রক্রিয়াও থাকে না সরকারের।

কয়েকজন ভোক্তা ও খুচরা ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আগে যে ডিপ্লোমা গুঁড়োদুধের কেজি বিক্রি হতো ৫৯০ টাকায় সে গুঁড়োদুধ বাজেট পেশের পর বিক্রি হচ্ছে ৬১০ টাকায়। কয়েকদিন আগে বিক্রি হওয়া ২৫০ টাকা দামের ৫০০ গ্রাম ওজনের মার্কস গুঁড়োদুধ বিক্রি হচ্ছে ২৬৫ টাকায়।

আমদানিকৃত চিনিতে শুল্কারোপের প্রস্তাবের পরপরই বেড়ে গেছে চিনির দামও। অথচ এখনো নতুন শুল্কে চিনি আমদানিই হয়নি। শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দা আজিজুর রহমান জানান, চিনি কেজিপ্রতি ২ টাকা করে বেড়েছে। কারওয়ান বাজারের চিনি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাজেট ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চিনির দাম বেড়ে গেছে।

৫০ কেজির বস্তাপ্রতি পাইকারি মূল্য ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার যে চিনি ৪৭ টাকা কেজি দরে পাইকারি বিক্রি হয়েছে শুক্রবার তা বিক্রি হয়েছে ৪৮ টাকায়।

একই বাজারের বিক্রেতা মজিদ বলেন, বুধবার (১২ মে) প্রতি কেজি ভারতীয় পিয়াজের দাম ছিল ২৪ টাকা। গতকাল সেটা বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকায়। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, তাদের এ পিয়াজ বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। একই চিত্র রসুন, হলুদ, আদা, মরিচসহ বেশকিছু পণ্যের ক্ষেত্রেও। ৭০ টাকার দেশি ও চায়না রসুন কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৯০ টাকা।

অতিরিক্ত শুল্কারোপের প্রস্তাব আসার পরপরই বেড়ে গেছে সিগারেটের দাম। ১২ টাকার বেনসন রাতারাতি হয়েছে প্রতি শলাকা ১৫ টাকা। ৮ টাকার গোল্ডলিফ হয়ে গেছে প্রতি শলাকা ১০ টাকা। ৫ টাকার নেভি ও স্টার এখন বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকায়। আর ৩ টাকার পাইলট, হলিউড, ডারবি ও শেখ সিগারেট বিক্রি হচ্ছে শলাকা ৫ টাকায়।

প্রস্তাবিত বাজেটে স্বর্ণ আমদানিতে শুল্কহার ভরিপ্রতি এক হাজার টাকা কমানোর কথা বলা হয়েছে। ফলে স্বর্ণের দাম যেখানে কমে যাওয়ার কথা সেখানেই বাজেট ঘোষণার রাতেই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। ১৩ জুন রাত পৌনে ১০টার দিকে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি বিজ্ঞপ্তিতে জানায় ১৪ জুন শুক্রবার থেকে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি কিনতে লাগবে ৫১ হাজার ৩২২ টাকা। বাজেটের আগে এর দাম ছিল ৫০ হাজার ১৫৫ টাকা। ৪৭ হাজার ৮২২ টাকার ২১ ক্যারেট স্বর্ণ এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৮ হাজার ৯৮৯ টাকায় এবং ৪২ হাজার ৮০৭ টাকার ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ৪৩ হাজার ৯৭৩ টাকায়। ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ভরিতে এক হাজার ১৬৭ টাকা দাম বেড়েছে।

বাজেটের পরপরই নিত্যপণ্যের দামবৃদ্ধির ব্যাপারে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া খোলা কাগজকে বলেন, ‘প্রতিবছর বাজেট হয়, সে বাজেটের প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের নিত্যব্যবহার্য পণ্যে। ভোক্তা হিসেবে বলতে পারি, বাজেটের ইতিবাচক প্রভাব পড়ার নজির খুব কম। বাজেট মানেই ধরে নেওয়া হয় জিনিসপত্রের দাম বাড়বেই। আর যে জিনিসের দাম একবার বাড়ে তা আর কমে না। বাজেটে যেসব জিনিসের দাম বাড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয় সেসব জিনিসের দাম বেড়ে যায় বাজেট পাস হওয়ার আগেই। আর যেসব জিনিসের দাম কমার কথা বলা হয়, তা গোটা অর্থবছরে কোথাও কমে বলে আমাদের জানা নেই। বাজেটের পর অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যাওয়া জিনিসের দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি।’

বাজারে বাজেটের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে বলে মনে করেন হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা আমরা বলি না। কিন্তু বাজারে ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে সরকারের সুস্পষ্ট নীতি থাকা দরকার। বাজেটের পর অযথা পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়া রোধ করতে সরকারের মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত। সেই সঙ্গে নিম্নবিত্ত শ্রেণির নিত্যব্যবহার্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম নাগালের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো সিন্ডিকেট যেন বাজেটের সুবিধাকে নেতিবাচকভাবে কাজে না লাগায় সেদিকে নজর রাখতে হবে।