হুমকিতে অনলাইন ব্যাংকিং

ঢাকা, রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৭ আশ্বিন ১৪২৬

এটিএম বুথে সাইবার জালিয়াতি

হুমকিতে অনলাইন ব্যাংকিং

জাফর আহমদ ১০:৩০ অপরাহ্ণ, জুন ০৮, ২০১৯

print
হুমকিতে অনলাইন ব্যাংকিং

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে অভিনব সাইবার জালিয়াতির পর অনলাইন ব্যাংকিং নিয়ে ভাবনায় পড়েছে ব্যাংকগুলো। গ্রাহক চাহিদা ও আধুনিক ব্যাংকিংয়ের কথা বিবেচনা করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অটোমেশন করলেও এসব অটোমেশনের নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেশের ব্যাংকগুলো ছোট ও আর্থিক সামর্থ্য কম হওয়ায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। আর একের পর সাইবার অপরাধের ফলে ব্যাংক খাত অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ, গত ৩১ মে দুই বিদেশি নাগরিক ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ (অটোমেটেড টেলার মেশিন) হ্যাক করে টাকা হাতিয়ে নেন।

এ দফায় এটিএম বুথ জালিয়াতির কৌশলটি ছিল বিদেশ থেকে বুথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং টাকা তুলে নেওয়ার সময় সার্ভার স্পর্শ না করা। এর আগে, ২০১৬ সালে জালিয়াতি চক্র তিনটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিয়েছিল। এটিএম ব্যবস্থাকে অকার্যকর করতে স্কিমিং করে গ্রাহকের পিন শিল্ড চুরি করে টাকা তুলে নিয়েছিলেন তারা। সে দফায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে বুথগুলোতে জরুরিভিত্তিতে অ্যান্টি-স্কিমিং ও পিন শিল্ড ডিভাইস স্থাপন করা হয়। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ঘটনার পর আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের জালিয়াতি রোধ করতে হলে দুটি পথ খোলা রয়েছে। সর্বাধুনিক মানের এটিএম বুথ স্থাপন করা অথবা বুথে জ্যামার মেশিন বসিয়ে জালিয়াতি চক্রের প্রযুক্তিকে অকার্যকর করে রাখা।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জালিয়াতি রোধে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ দুটি ব্যবস্থা কার্যকর করা ব্যয়সাধ্য। এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, সর্বাধুনিক এটিএম বুথ কিংবা জ্যামার মেশিনদুটি ব্যবস্থার কোনোটাই বাংলাদেশের জন্য খুব সহজ হবে না। জ্যামার মেশিন কিনতে গেলে প্রতিটির জন্য গুনতে হবে প্রায় দেড়শ ডলার। এ ক্ষেত্রে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পাঁচ হাজার বুথের জন্য অতিরিক্ত ছয় কোটি টাকা গুনতে হবে। এর বাইরে অন্যান্য ব্যাংকেরও এটিএম বুথ রয়েছে। আর সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বুথ স্থাপন করতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা আমাদের অর্থনীতির জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক ও গ্রাহকের জন্য সহনশীল সেটাও দেখতে হবে। এরপরও যে কোনোভাবে হোক গ্রাহক স্বার্থরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে।

২০১৬ সালের শুরুর দিকে ইস্টার্ন, সিটি ও ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চারটি বুথ থেকে টাকা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরিভিত্তিতে অ্যান্টি-স্কিমিং ও পিন শিল্ড ডিভাইস বসাতে নির্দেশ দিয়েছিল। এ জন্য গ্রাহককে সরাসরি এর খরচ বহন না করতে না হলেও নানাভাবে এ অর্থ তুলে নিয়েছিল বাণিজ্যিক ব্যাংক তিনটি। কিন্তু প্রথমেই বড় ধরনের খরচ ধাক্কা সামলাতে হয়েছিল বাণিজ্যিক ব্যাংক তিনটিকে।

অর্থনীতিবিদ ও পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, পুরো ব্যাংকিং খাত এখন নিরাপত্তাহীন। খোলা কাগজকে তিনি বলেন, গ্রাহকদের চাহিদা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে প্রতিটি ব্যাংককে অটোমেশন করতে হবে-এর কোনো বিকল্প নেই। মানুষ আর লাইনে দাঁড়িয়ে ব্যাংকের লেনদেন করতে চান না। তারা চান ঘরে বসে লেনদেন করতে। তার মতে, ৫-৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক বাদে বাকি ৫০টি ব্যাংকই ছোট। এসব ব্যাংকের অটোমেশন করে তা আপডেট করা এবং শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা বিধান করা খুবই কঠিন। ফলে যেসব ব্যাংক অটোমেশন করবে তারা টিকে থাকবেন, যারা পারবে না তারা পিছিয়ে যাবেন। তিনি মনে করেন, ছোট ছোট ব্যাংককে অনুমোদন দেওয়ার ফলে ব্যাংক খাত তথা গ্রাহককে নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংক খাতের অটোমেশন কার্যক্রমে ঝুঁকির বিষয়টি শিকার করেন রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীও। তার মতে, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যারা এসব প্রযুক্তি বিক্রি করছে, তারা উত্তরোত্তর এর প্রসারও ঘটাচ্ছেন। তারা উন্নততর এ ধরনের প্রযুক্তি বিক্রি করার জন্য নানা ধরনের অপকৌশল করছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশকে পরীক্ষার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলাম বলেন, এটিএম বুথের মতো স্পর্শকাতর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে সন্দেহ দেখা দিয়েছে যারা বুথে জালিয়াতি করছে তারা প্রযুক্তির উদ্ভাবকদের এজেন্ট কি না?