উদ্যোগেই গলদ

ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯ | ৬ বৈশাখ ১৪২৬

উদ্যোগেই গলদ

সুদহার কমেনি, এখনো ১০-১৬ শতাংশ

জাফর আহমদ ১০:৩৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

print
উদ্যোগেই গলদ

ব্যাংকের ঋণ বিতরণে গোড়ায় গলদ। এক বছর ধরে ব্যাংক ঋণের সুদ কমানোর নানা চেষ্টার কথা বলা হলেও আদৌ তা কাজে আসছে না। আগের মতোই যথারীতি ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদহারে ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। ঋণের সুদহার কমাতে ব্যাংক মালিকরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করতে পারেনি। সম্প্রতি শিল্প মেলায় প্রধানমন্ত্রী সে কথারই পুনরাবৃত্তি করেন।

ব্যাংক ঋণের সুদ কমানোর ক্ষেত্রে শুধু প্রতিশ্রুতিতে কাজ হবে না বলে মনে করছেন পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, সুদহার কমাতে আগে সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। সেটা না করে মুখে মুখে খেলাপি ঋণ কমানোর কথা বলা হয়েছে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকে তারল্য সংকট, গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে পারছে না। এর পেছনের কারণ হলো, খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না। সঞ্চয়পত্রে টাকা চলে যাচ্ছে, ব্যাংকে আসছে না। বৈদেশিক বাণিজ্যের নেতিবাচক ধারা অব্যাহত আছে। এর ফলে সুদহার বাড়ছে। সুদহার কমাতে হলে এসব সমস্যার সমাধানে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে সুদহার কমানোর উদ্যোগ মুখেই থেকে যাবে।

২০১৮ সালের শুরুতে ব্যাংক মালিকরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে প্রতিশ্রুতি দেন তারা ঋণ বিতরণে সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনবেন। একইভাবে আমানত সংগ্রহ করবেন ৬ শতাংশ হারে। পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলন করে ব্যাংক মালিকরা একই কথা বলেন। এ জন্য তারা বাড়তি সরকারি আমানত আদায় করে নেন। কম সুদের এ সরকারি মোট আমানতের ৭৫ ভাগ রাখত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বিধিবদ্ধ জমা হিসেবে সিএসআর হারও কমিয়ে আনে। এর ফলে আমানতের একটি বড় অংশ বিনিয়োগ করার সুবিধা পায় ব্যাংকগুলো। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সুদহার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। কৃষি ঋণ বাদে সব ঋণই এখন বিতরণ হচ্ছে ১২ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যাংক মালিকরা তাদের কথা রাখেননি। এক বছর পর শিল্প মেলায় প্রধানমন্ত্রীর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ব্যাংক মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সুদহার কমাতে হবে।

ব্যাংকিং খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সুদহার কমানো সম্ভব নয়। মূল সমস্যা চিহ্নিত না করে সুযোগ-সুবিধা দিলে খেলাপির মতো তারাও এ অর্থ নিয়ে যাবে, কোনো কাজ হবে না। তারা মুখে বললেও ঋণের সুদহার কমাবে না। সুদহার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা আমানত সুবিধা নিয়ে গেলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সুদহার কমায়নি। সমস্যা চিহ্নিত করার ব্যর্থতার কারণে সুদহার কমানো সম্ভব হয়নি।

তাদের মতে, মূল সমস্যাগুলো হলো মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, বৈদেশিক বাণিজ্যের নেতিবাচক ধারার পাশাপাশি আমানত সংগ্রহে আগ্রাসী ব্যাংকিং, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংক রেট’ ও রেপোর সুদহার বেশি। এসব সমস্যা সমাধান না করে ব্যাংক ঋণের সুদহার কমা সম্ভব নয়।

ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। যা মোট ঋণের সাড়ে ১০ শতাংশ। নন-পারফর্মিং এ ঋণ মন্দ গ্রাহকের কাছে পড়ে থাকলেও আমানতকারীকে ঠিকই সুদ দিতে হয়। আবার এ ঋণের বিপরীতে ৫৭ হাজার ৪৪ কোটি টাকা প্রভিশন হিসেবে রাখতে হয়। যার পুরোটাই মুনাফা থেকে রাখতে হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ টাকা তুলে নেয় ঋণের ভালো গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত সুদ বসিয়ে। ফলে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সুদ কমাতে প্রতিশ্রুতি যতই দেওয়া হোক বাস্তবে সুদহার কমানো সম্ভব নয়।

এ ব্যাপারে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই, ফেব্রুয়ারি আট মাসে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। অথচ পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকের চেয়ে বেশি সুদে সরকার এ টাকা নিচ্ছে। ঘাটতি বাজেট মেটাতে সরকার এ টাকা ব্যয় করছে। ফলে ব্যাংকে টাকা যাচ্ছে না। এলসি খোলার ডলার সংগ্রহেও ব্যাংকের অর্থের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে। যে পরিমাণ রপ্তানি ব্যয় হচ্ছে তার চেয়ে বেশি অর্থের আমদানি ব্যয় মেটানো লাগছে। ব্যাংকের তারল্য সংকটের এটা অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, তারল্য সংকট কমাতে রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ বৈধ পথে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংকের সুদহার কমাতে এসব ব্যবস্থা না নিয়ে সুদহার কমানোর উদ্যোগ সফল হবে না।