উৎসবের কাঁটা জাল টাকা

ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ৫ কার্তিক ১৪২৫

উৎসবের কাঁটা জাল টাকা

সাজেদুর রহমান ১০:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০১৮

print
উৎসবের কাঁটা জাল টাকা

ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল টাকার চক্র। কেনাকাটার ব্যস্ততায় অনেক সময় ক্রেতা-বিক্রেতারা টাকা দেখে নেওয়ার সুযোগ পান না। এ অসচেতন মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে চক্রটি ছড়িয়ে দেয় জাল নোট। সম্প্রতি কোটি টাকার জাল নোটসহ একটি চক্র গ্রেপ্তারও হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাল টাকা দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট হুমকি। এসব অপরাধীদের অনেককে পাকড়াও করা হলেও তারা আবার জামিনে বেরিয়ে এসে একই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। উৎসবের সময় জাল নোটের বিস্তার বেশি ঘটে বলে প্রবাদ তৈরি হয়েছে ‘জাল টাকা উৎসবের কাঁটা’।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঢাকাসহ সারা দেশে ১০ থেকে ১৫টি চক্র সক্রিয় আছে। এরা রোজার ঈদে ৮ থেকে ১০ কোটি জাল টাকা বাজারে ছাড়তে পারে। এরই মধ্যে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে ৫টি চক্রের ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়াও অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সারা দেশে মাঠ পর্যায়ে বেশ কয়েকজন জাল নোট চক্রের সদস্যকে আটক করেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন এর আগে বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছিল। নানা ভাবে তারা ছাড়া পেয়ে নতুন সদস্য সংগ্রহ করে আবারও মাঠে নিমেছে। ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্য জানান, রাজধানীতে জাল টাকা তৈরির ৮-৯টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
ডিবি জানায়, জাল টাকার চক্রদের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত আছে। তবে এ বছর উদ্ধার হওয়া জাল টাকা আগের টাকার চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত। আসল টাকার মতো নিরাপত্তা সুতা স্থাপন করা হয়েছে। সাধারণ চোখে বোঝা খুবই কঠিন, এটা জাল টাকা।
এর আগে, গত ২৪ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের দক্ষিণ সস্তাপুর এলাকা থেকে ৪২ লাখ টাকার জাল নোট ও বিপুল পরিমাণ জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ দুজনকে আটক করে র‌্যাব। আর ৮ মে জাল টাকা দিয়ে জমি কেনার চেষ্টা করার সময় কঙ্গোর দুই নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে টাকা তৈরির মেশিন ও বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং একটি প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়েছে।   
র‌্যাব-২ এর এএসপি শহিদুল ইসলাম জানান, এসব সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আটকের জন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। দেশের বিভিন্ন জেলায় তৎপরতা চলছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এ জালিয়াত চক্র বর্তমানে ব্যাপক হারে তাদের জাল টাকা বিস্তার করেছে। অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে তারা টাকা জাল করে বাজারে ছাড়ছে। দেখতে হুবহু আসলের মতো। কিন্তু পুরোটাই নকল।
সারা দেশে অনেক জাল টাকা তৈরির কারখানার খবরও ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে। জানা যায় টাকা জাল করার প্রতিটি কারখানায় ঘণ্টায় প্রায় দুই লাখ টাকার জাল নোট তৈরি হয়। এসব জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব অপরাধীদের অনেককে পাকড়াও করা হলেও তারা আবার জামিনে বেরিয়ে এসে একই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আইনের ফাঁক থাকায় এ অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। এদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও সাক্ষীর অভাবে তা অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ করা দুরুহ হয়ে পড়ে। আর এভাবেই জালিয়াত চক্র সহজেই বড় ধরনের অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। জাল নোটের বিস্তার ঠেকাতে ব্যাংক ব্যবস্থায় জাল নোট শনাক্তকারী মেশিনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন অনেকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে দেশের কাগুজে মুদ্রার নিরাপত্তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও ভাবতে হবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে মেশিনে আসল নকল বোঝার সুযোগ নেই। এ মেশিন ছাড়াও কি দেখে নকল টাকা চেনা যাবে সে বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে গণমাধ্যমে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মূল ক্রিমিনালদের ধরে না : সালেহ উদ্দিন আহমেদ
সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ জাল টাকা বিস্তার ঠেকাতে তিনটি প্রস্তাবের কথা জানিয়েছেন। এক, জাল টাকা বিষয়ে সবার সচেতন হতে হবে। মূলত ১০০০, ৫০০ এবং ১০০ টাকার নোটে জাল পাওয়া যায়। সে কারণে এসব নোট লেনদেনে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এসব নোটে যে সব সিকিউরিটি চিহ্নিত থাকে সেগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা তা দেখে লেনদেন করতে হবে। দুই, যেসব জায়গায় বড় বড় ট্রানজিট হয় সেসব জায়গায় লেনদেনে জালনোট শনাক্তকরণ মেশিনের ব্যবহারে করতে হবে। তিন, বড় বড় ব্যবসায়ীরা যাতে বড় ধরনের লেনদেন নগদ টাকায় না করে। আর যদি একান্ত করতেই হয় সে ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোনোভাবে জাল টাকা ঢুকে না পড়ে।
এসব উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি। সাধারণ মানুষের পক্ষে মেশিনে আসল নকল বোঝার সুযোগ নেই। এ মেশিন ছাড়াও কি দেখে নকল টাকা চেনা যাবে সে বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে গণমাধ্যমে।
তিনি বলেন, আমি মনে করি এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি জাল টাকা তৈরি করা বা এর সঙ্গে জড়িতদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একটা বিষয় বুঝতে হবে। জাল টাকা ঢুকে পড়লে মূল অর্থনীতিকে ক্ষত্রিগ্রস্ত করবে। বিশেষ করে উৎসব বা যে সময় নগদ টাকার লেনদেন বেশি হয় তখন জাল টাকার কারবারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাড়তি সতর্কতা নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি আছে। দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাধারণত নিম্নস্তরের জাল টাকার কারবারিদের ধরে। যারা মেইন ক্রিমিনাল তাদের ধরতে পারে না। এতে অপরাধীদের মূল শেকড় উৎপাটন হয় না। আবার যাদের ধরা হলো তাদের যথাযথ তদন্তের অভাবে আইনের প্রয়োগ করা যায় না। জাল টাকা তৈরি ও বিপণন ফৌজদারি অপরাধ। এতে জড়িতদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ধরনের অপরাধীদের শক্ত দণ্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারলে অপরাধ কিছুটা কমে।
তিনি বলেন, ‘আমার সময়ে আমি জাল টাকার কারবারিদের ব্যাপারে গুরু দণ্ডের সুপারিশ করেছিলাম। সেভাবে কাজ অনেকটা এগিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি।’

 
.