নির্বাচনের আগে সংযমে বাংলাদেশ ব্যাংক

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

নির্বাচনের আগে সংযমে বাংলাদেশ ব্যাংক

জাফর আহমদ ১০:২৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৫, ২০১৮

print
নির্বাচনের আগে সংযমে বাংলাদেশ ব্যাংক

একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম পরিপালনে গুরুতর বরখেলাপ করেছে। সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ব্যাংকটিকে চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উপর’ থেকে থামিয়ে দেওয়া হয়। জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে এসেছে, তাই এখন বাণিজ্যিক ব্যাংক যে অনিয়মই করুক কোনো চিঠি দেওয়া যাবে না। এ ঘটনা একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রেই নয়, পুরো ব্যাংকিং ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নির্বাচনের আগে মানুষের কাছে ব্যাংক সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যায়-এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। এমন তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি শাখা ও নীতি বিভাগ, ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইড সুপারভিশন, ব্যাংকিং পরিদর্শনসহ গুরুত্বপূর্ণ শাখা থেকে।  বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রস্তুত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে স্বর্ণ সংরক্ষণে ‘ভুতুড়ে’ কাণ্ড অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন। কমিটি পর পর তিনবার সময় বৃদ্ধি করে গত মাসে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে ভল্টে স্বর্ণ সংরক্ষণ ও ভুতুড়ে কাণ্ড নিয়ে ‘প্রকৃত ঘটনা’ বের করার পাশাপাশি স্বর্ণ সংরক্ষণে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে। সুপারিশ কার্যকর না হওয়ার কারণে    বাংলাদেশ ব্যাংক আটক করা স্বর্ণ আর সরাসরি রাখতেও পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ নির্বাচনের আগে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে হৈচৈ চান না।
একই অবস্থা ঘটতে যাচ্ছে ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ গ্রন্থের ত্রুটি খুঁজে বের করতে গঠিত তদন্ত কমিটিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম ও মহাব্যবস্থাপক আহমেদ আলী। কমিটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো গ্রিন সিগন্যাল মেলেনি। এ কারণে ‘তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে আপাতত ভাবছে না’ তদন্ত কমিটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য একটি সূত্র জানায়, স্বর্ণ নিয়ে ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটনার অপর পক্ষ সরকারের আরেকটি দপ্তর এনবিআর। এ কারণে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। এ কারণে ভেবেচিন্তে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে চায়।       
দুটি ঘটনার ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকাণ্ড ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। দেশের সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বর্ণে ভেজাল পাওয়ার বিষয়টি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমালোচনা শুরু হয়। এ খবর প্রকাশিত হওয়া পর নড়েচড়ে বসে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ ব্যাপারে বিবৃতি দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আরও নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে সরকারও নাখোশ হয়। অপর ঘটনাটি হলো ত্রুটিপূর্ণ ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’। গ্রন্থটিতে বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে যুক্ত করা হয় আইউব খান ও মোনায়েম খানের ছবি। বিষয়টি দৈনিক খোলা কাগজে প্রকাশিত হওয়ার পর আরেকবার সমালোচনায় পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। পৃথক দুটি ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত কমিটি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করলেও নির্বাচনের আগে প্রকাশ করতে চায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের আশঙ্কা এ রিপোর্ট প্রকাশ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক আবার নতুন করে সমালোচনায় আসবে।
নির্বাচনের আগে সরকারি খাতে ঋণ বিতরণেও ধীরে চলো রীতি অনুসরণ করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর শেষে ৯ লাখ ১৮ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আগের বছরেই একই সময়ে বিতরণ করা হয়েছে ৮ লাখ ১ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া ও সরকারি আমানত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় ঋণ বিতরণের হার বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু সে হারে ঋণ বিতরণ বাড়েনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নির্বাচনের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগ করতে আসছেন না। ব্যাংকগুলোও দেখে শুনে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে, এ কারণে বেসরকারি খাতে আশানুরূপ ঋণ বিতরণ হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বিষয়টিকে এভাবে দেখছেন না। তিনি গতকাল খোলা কাগজকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ‘রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন’ অনুযায়ী চলছে, নির্বাচনের জন্য শৈথিল্য করছে না। তবে কোনো ব্যাংক বড় ঋণ বিতরণে সতর্কতা অবলম্বন করলে সেটা ব্যাংকের বিষয়। ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ গ্রন্থে ত্রুটি ও স্বর্ণ নিয়ে ‘ভুতুড়ে কাণ্ড’ তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বর্ণ জমার ব্যাপারে কমিটি সুপারিশ করেছে। আর ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ বই সম্পর্কে তিনি বলেন, সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।